বিশ্বজুড়ে যখন ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনা তুঙ্গে, তখন এক ভিন্ন ও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি গাজা উপত্যকার বাসিন্দারা। ইসরায়েলের ভয়াবহ আগ্রাসনে গাজা এখন এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। এই ধ্বংসস্তূপের মাঝেই গাজার মানুষ বিশ্বকাপ উপভোগের চেষ্টা করছে, আর তাদের বিশ্বকাপ দেখার একমাত্র অবলম্বন হলো মোবাইল ফোন।
ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত প্রায় ৭৩ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অনেক ক্রীড়াবিদও রয়েছেন। অসংখ্য খেলোয়াড় আহত হয়েছেন। যারা বেঁচে আছেন, তাদের ফুটবলানন্দ এখন স্টেডিয়ামের ধ্বংসাবশেষ ঘিরেই। আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে গাজার ফুটবলের এই বেদনাদায়ক চিত্র উঠে এসেছে।
আলি তাফেশের সংগ্রাম: ক্র্যাচে ভর করে ফুটবলে ফেরা
২৪ বছর বয়সী তরুণ আলি তাফেশকে দেখা যায় ক্র্যাচে ভর দিয়ে বলের পেছনে ছুটতে, গাজা আল-ইরাদা ফুটবল ক্লাবের সতীর্থকে পাস দিতে। অথচ মাত্র চার বছর আগেও আলি একজন স্বাভাবিক মানুষ ছিলেন। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ তিনি গাজার একটি ক্যাফেতে বন্ধুদের সঙ্গে বসে উৎসবমুখর পরিবেশে উপভোগ করেছিলেন। ইসরায়েলি হামলায় তিনি তার একটি পা হারিয়েছেন, কিন্তু তবুও তিনি ক্র্যাচে ভর করে ফুটবলে মেতে ওঠার চেষ্টা করেন।
অতীতের মধুর স্মৃতি রোমন্থন করে আলি বলেন, “২০২২ বিশ্বকাপে সবাই নিজেদের পছন্দের দলকে সমর্থন করত। পরিবেশটা ছিল উৎসবমুখর। কিন্তু আজ গাজা কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। যেকোনো মুহূর্তে হামলা ও মৃত্যুর ঝুঁকিতে আছি আমরা।”
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পূর্ব গাজা শহরের জেইতুন মহল্লায় নিজ বাড়িতে ইসরায়েলি হামলার শিকার হন আলি। সেই হামলায় তার মা ও ভাই প্রাণ হারান। আলি বেঁচে গেলেও তার একটি পা কেটে ফেলতে হয়। একসময় তিনি একজন দৌড়বিদ হিসেবে স্থানীয় চ্যাম্পিয়নশিপে পদক জিতেছিলেন।
পা হারানোর পর জীবনের দিশা হারিয়ে ফেলেছিলেন আলি। তিনি বলেন, “আমি একজন চ্যাম্পিয়ন ছিলাম। আমার পদক ছিল। পা কেটে ফেলার পর জীবনের দিশা হারিয়ে ফেলেছিলাম। গাজা আল-ইরাদার হয়ে খেলা আমার বন্ধুরা আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। আমি তাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার অনুমতি চাইলে, তারা আমাকে সাদরে গ্রহণ করে।”
ক্রীড়াবিদদের প্রতিবন্ধকতা ও ফিফার প্রতি আহ্বান
আলির মতো আরও অনেক ক্রীড়াবিদ ইসরায়েলি হামলায় অঙ্গ হারিয়েছেন। শত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও তারা খেলাধুলায় আনন্দ খুঁজে ফেরেন। তাদের দাবি, ফিলিস্তিনের ক্রীড়া ক্ষেত্রের জন্য ফিফা কোনো সহযোগিতা করেনি। গাজার ফুটবলের পুনর্জাগরণ এবং স্টেডিয়াম পুনর্নির্মাণের জন্য ব্যাপক সহযোগিতা প্রয়োজন।
গাজা আল-ইরাদা ফুটবল ক্লাবের কোচ হাতেম আল-মুগরেবি বিশ্বকাপকে গাজার ক্রীড়াবিদদের জন্য এক বেদনাদায়ক স্মারক হিসেবে দেখছেন। তিনি জানান, যুদ্ধে অনেক খেলোয়াড় হাত বা পা হারিয়েছেন এবং তারা এখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।
