ড. মুহাম্মদ মুরসি মিসরের ইতিহাসে প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি এবং সমসাময়িক মুসলিম বিশ্বের অন্যতম আলোচিত প্রভাবশালী ইসলামপন্থী নেতা। ১৯৫১ সালের ২০ আগস্ট মিসরের নীল ডেল্টা অঞ্চলের শারকিয়া প্রদেশের আল-আদওয়া গ্রামে তার জন্ম। সাধারণ কৃষক পরিবারে বেড়ে ওঠা মুরসি কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যাটেরিয়ালস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ইখওয়ানুল মুসলিমিনের সক্রিয় সদস্য মুরসি ২০১১ সালের আরব-বসন্ত পরবর্তী রাজনৈতিক ধারায় ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির প্রার্থী হিসেবে ২০১২ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সংবিধান সংস্কার ও বেসামরিক শাসন জোরদারের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করলেও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন ও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতের কারণে মাত্র এক বছরের মাথায় ২০১৩ সালের ৩ জুলাই তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। দীর্ঘ কারাবন্দিত্ব ও বিচার প্রক্রিয়ার পর ১৭ জুন ২০১৯ সালে আদালত কক্ষেই তার মৃত্যু হয়।
দাতুক সেরি আনোয়ার ইবরাহিম সমসাময়িক মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ইসলামপন্থী ও গণতান্ত্রিক রাজনীতিক। ১৯৪৭ সালের ১০ আগস্ট মালয়েশিয়ার পেনাং রাজ্যের বুকিত মার্তাজামে তার জন্ম। মালয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনকারী আনোয়ার ছাত্রজীবনে ইসলামি ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি অইওগ (Angkatan Belia Islam Malaysia)-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে পরিচিতি পান। ১৯৮২ সালে ক্ষমতাসীন UMNO দলে যোগ দিয়ে তিনি শিক্ষামন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী এবং ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মুহাম্মদের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে পদচ্যুত ও কারাবন্দি হলেও দীর্ঘ সংগ্রামের পর ২০২২ সালে তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
রশিদ আল-গান্নুশি আধুনিক মুসলিম বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইসলামপন্থী চিন্তাবিদ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। ১৯৪১ সালের ২২ জুন তিউনিসিয়ার গাবেস প্রদেশের এল-হাম্মা গ্রামে তার জন্ম। জেইতুনা বিশ্ববিদ্যালয়সহ মিসর ও সিরিয়ার দামেস্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিষয়ে পড়াশোনা করা গান্নুশি ১৯৭০-এর দশকে ইসলামি পুনর্জাগরণমূলক রাজনীতিতে যুক্ত হন। আন-নাহদা আন্দোলনের প্রধান হিসেবে তিনি স্বৈরশাসনের সময় দীর্ঘ ২০ বছর প্রবাস জীবন কাটাতে বাধ্য হন। ২০১১ সালে দেশে ফিরে তিনি ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিউনিসিয়ার পার্লামেন্টের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সশস্ত্র বিপ্লবের পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও বহুদলীয় ব্যবস্থার পক্ষে কাজ করেছেন।
কিং ফয়সাল বিন আবদুল আজিজ আলে সৌদ আধুনিক সৌদি আরবের ইতিহাসে এক দূরদর্শী শাসক। ১৯০৬ সালের ১৪ এপ্রিল রিয়াদে জন্মগ্রহণকারী ফয়সাল ছিলেন সৌদি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা কিং আবদুল আজিজ ইবনে সৌদের তৃতীয় পুত্র। ১৯৬৪ সালে বাদশা হওয়ার আগে তিনি দীর্ঘদিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার শাসনামলে শিক্ষা সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক সংস্কার ও অর্থনৈতিক আধুনিকায়ন ঘটে। তিনি বিচারব্যবস্থায় শরিয়ার প্রাধান্য বজায় রেখে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। ১৯৬৯ সালে ওআইসি (OIC) প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রাখা কিং ফয়সাল ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের সময় পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে তেল অবরোধ আরোপ করে মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন করেন। ১৯৭৫ সালের ২৫ মার্চ তিনি আততায়ীর গুলিতে নিহত হন।
ইরানের মাহমুদ আহমদিনেজাদ সমসাময়িক বিশ্বরাজনীতিতে এক সময়ের অত্যন্ত প্রভাবশালী ও বিতর্কিত ইসলামপন্থী রাষ্ট্রনায়ক। ১৯৫৬ সালের ২৮ অক্টোবর ইরানের সেমনান প্রদেশের আরাদান শহরে তার জন্ম। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি ডিগ্রিধারী আহমদিনেজাদ ২০০৩ সালে তেহরানের মেয়র নিযুক্ত হন। ২০০৫ সালে ইরানের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে তিনি ২০১৩ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সামাজিক ভর্তুকি বৃদ্ধি ও গ্রামীণ উন্নয়নের উদ্যোগ নেন এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাশক্তির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। পারমাণবিক কর্মসূচির অধিকার রক্ষা ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে তার আপসহীন অবস্থান তাকে মুসলিম বিশ্বে পরিচিতি দেয়।
ওমর হাসান আহমদ আল-বশির সুদানের দীর্ঘতম শাসক এবং সমসাময়িক মুসলিম বিশ্বের অন্যতম ইসলামপন্থী রাষ্ট্রনায়ক। ১৯৪৪ সালের ১ জানুয়ারি সুদানের হোশ বানাগা গ্রামে তার জন্ম। সুদান মিলিটারি একাডেমি ও মিসরের কায়রো মিলিটারি কলেজে প্রশিক্ষণ নেওয়া বশির ১৯৮৯ সালের ৩০ জুন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। তিনি প্রায় ৩০ বছর সুদানের ক্ষমতায় ছিলেন এবং শরিয়া আইন বাস্তবায়নের প্রবক্তা ছিলেন। দারফুর সংকট ও গৃহযুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনে। দীর্ঘ অর্থনৈতিক সংকট ও গণআন্দোলনের মুখে ২০১৯ সালে তিনি ক্ষমতাচ্যুত ও গ্রেপ্তার হন।
মুয়াম্মার মুহাম্মদ আবু মিনইয়ার আল-গাদ্দাফি লিবিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকা শাসক। ১৯৪২ সালের ৭ জুন সির্ত অঞ্চলের একটি দরিদ্র পরিবারে তার জন্ম। ১৯৬৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতা দখল করেন। তিনি ‘গ্রিন বুক’-এ বর্ণিত আরব সমাজতন্ত্র ও ইসলামি মূল্যবোধের সমন্বয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। লিবিয়ার তেল সম্পদ জাতীয়করণ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক বিনিয়োগের মাধ্যমে তিনি জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও মুসলিম-আফ্রিকান ঐক্যের কণ্ঠস্বর গাদ্দাফি ২০১১ সালের ন্যাটো সমর্থিত বিদ্রোহের মুখে ২০ অক্টোবর নিহত হন।
মোল্লা মুহাম্মদ ওমর আফগানিস্তানের ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী ইসলামপন্থী নেতা। ১৯৫৯ বা ১৯৬০ সালে কান্দাহারে তার জন্ম। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেওয়া মোল্লা ওমর ১৯৯৪ সালে তালেবান আন্দোলনের সূচনা করেন। ১৯৯৬ সালে কাবুল দখলের পর তিনি ‘আমিরুল মোমিনিন’ হিসেবে ইসলামিক এমিরেট অব আফগানিস্তান প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০১ সালের ৯/১১ হামলার পর ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে তিনি বিশ্বরাজনীতিতে আলোচিত হন। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আক্রমণের মুখে তালেবান সরকারের পতন ঘটলে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। ২০১৩ সালে অসুস্থতাজনিত কারণে তার মৃত্যু হয়, যা ২০১৫ সালে প্রকাশ পায়।

