বিচার দেখতে চায় ভুক্তভোগী সবাই

দ্রুত বিচার ও দীর্ঘসূত্রতার দ্বৈরথ: ন্যায়বিচারের আশায় ভুক্তভোগীরা

আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার মামলার রায় মাত্র ২০ দিনে সম্পন্ন হওয়ায় দেশজুড়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে মানুষ। এই দ্রুত বিচার প্রমাণ করে যে, দেশে এ ধরনের নিষ্ঠুরতার দ্রুত বিচার সত্যিই সম্ভব। তবে, ঢাকার শিশু রামিসার মামলা দ্রুত বিচার পেলেও চট্টগ্রামের শিশু জান্নাতুল নাইমা ইরার মামলা কেন এখনো ঝুলে আছে, এই প্রশ্ন এখন সবার মনে। শুধু ইরা নয়, গত এক দশকে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার তিন শতাধিক শিশুর পরিবারও এখন ন্যায়বিচার প্রত্যাশী।

পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা: হাজারো মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায়

বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে দেশে ছয় হাজারের বেশি শিশু ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যদিও বাস্তবে এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে। একই সময়ে অন্তত ৩১০ জন শিশুকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। দুঃখজনকভাবে, এসব ঘটনার বেশিরভাগ মামলাই বছরের পর বছর ধরে নিষ্পত্তিহীন অবস্থায় পড়ে আছে, যা বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা এবং কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

আলোচিত মামলার দ্রুত বিচার ও উচ্চ আদালতের দীর্ঘসূত্রতা

দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী কিছু ঘটনায় দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলেও, মামলার পরিণতি প্রায়শই আশানুরূপ হয় না। জনরোষ বিবেচনায় মামলা আমলে নিয়ে নিম্ন আদালতে দ্রুত রায় ঘোষণা করা হলেও, উচ্চ আদালতে গিয়ে তা দীর্ঘসূত্রতার জালে আটকে যায়। এমনকি কিছু আলোচিত ঘটনায় আসামিদের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে দেওয়ার নজিরও রয়েছে।

রূপা হত্যা মামলার উদাহরণ

২০১৭ সালে টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে ষোড়শী জাকিয়া সুলতানা রূপাকে গণধর্ষণ ও হত্যা মামলায় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। ওই মামলার বিচার থেকে রায় পর্যন্ত ছয় মাসেরও কম সময় লেগেছিল এবং আদালত তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। কিন্তু উচ্চ আদালতে দীর্ঘ শুনানি শেষে তিন আসামির সাজা কমিয়ে সাত বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

জান্নাতুল নাইমা ইরা ও তনু হত্যা মামলা

গত ১ মার্চ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে উদ্ধার হওয়া সাত বছরের শিশু জান্নাতুল নাইমা ইরার মর্মান্তিক ঘটনা এখনো অনেকের মনে দাগ কেটে আছে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বাবু শেখ নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও, তিন মাস পার হলেও ওই ঘটনায় বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়নি। পুলিশ এখনো অভিযোগপত্র দাখিল করতে পারেনি। অন্যদিকে, কুমিল্লার তরুণী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার বিচার শুরু হতে দীর্ঘ ১০ বছর লেগে গেছে, যা দেশবাসীকে কাঁদিয়েছিল।

নুসরাত জাহান রাফি ও আছিয়া হত্যা মামলা

২০১৯ সালে ফেনীতে মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার রায়ে ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড হলেও, প্রায় সাত বছর পরও মামলাটি হাইকোর্টে শুনানির অপেক্ষায় আটকে আছে। মাগুরার আট বছরের শিশুকন্যা আছিয়া, যাকে গত বছরের ৫ মার্চ বোনের শ্বশুরবাড়িতে নিষ্ঠুরভাবে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়, তার মামলায় ৭২ দিনে বিচার শেষ হলেও এখনো রায় কার্যকর হয়নি। আছিয়ার মা আয়েশা খাতুন ন্যায়বিচার পেতে দীর্ঘ অপেক্ষার কথা জানিয়েছেন।

বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা: অপরাধীদের সুবিধা

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশে আলোচিত ঘটনায় দ্রুত বিচারের নজির থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা দীর্ঘসূত্রতার শিকার হয়। রায় হলেও উচ্চ আদালতের চূড়ান্ত বিচার পর্যন্ত পৌঁছানো মামলার সংখ্যা খুবই কম। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নজির খুঁজতে গিয়ে ১৯৯৫ সালের দিনাজপুরের এক আলোচিত ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তিন আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে দীর্ঘ ৯ বছর লেগেছিল।

শিশু অধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, গত এক দশকে দেশে প্রায় ১২ হাজার শিশু নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হলেও বিচার হয়েছে সামান্যই। রামিসা হত্যার দ্রুত বিচার যেমন আশার আলো দেখাচ্ছে, তেমনি বিচারব্যবস্থার বৈষম্য নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছর এপ্রিল মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ছিল ৩১২টি, যা মে মাসে বেড়ে ৩২৬টিতে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, যৌন হয়রানি এবং আত্মহত্যার ঘটনা বৃদ্ধি উদ্বেগজনক।

আদালতে শিশু ধর্ষণসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা

ঢাকার বিভিন্ন আদালতে শিশু ধর্ষণসংক্রান্ত প্রায় তিন হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকার ৫০টি থানায় সব ধরনের ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে অন্তত ২১৪টি মামলা দায়ের হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নথিভুক্ত মোট এক লাখ ৮১ হাজার ৭৩৭টি মামলার মধ্যে ২১ হাজার ৯৩৬টি ছিল নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা, যা সর্বোচ্চ।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ১১ হাজার ৯৩৪টি শিশু নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে মামলা হয়েছে ছয় হাজার ১৩৫টি। একই সময়ে ছয় হাজার ৩১ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে পাঁচ হাজার ৬৩১ জন মেয়ে এবং ৪০০ জন ছেলে শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে অন্তত ৩১০ জন শিশুকে। আসকের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন বছরে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা এবং মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, যেখানে ২০১৯ সালে সর্বোচ্চ ৫৫ জন শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়।

শিশু অধিকারকর্মীদের মতামত

শিশু অধিকারকর্মীদের মতে, প্রকৃত ঘটনা নথিভুক্ত তথ্যের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। সামাজিক সংকোচ, ভয় এবং বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক পরিবারই নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ বা মামলা করতে আগ্রহী হয় না। ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের (বিটিএস) পরিচালক মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে দেখা যায়, শিশু নির্যাতন বা ধর্ষণের যতগুলো ঘটনায় মামলা হচ্ছে, তার চেয়ে সংঘটিত ঘটনা কয়েক গুণ বেশি। অপরাধীদের শাস্তির আওতায় না আনা এবং আলোচিত ঘটনা ছাড়া অন্যান্য সহিংসতার বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপের অভাব বিচার ব্যবস্থার বড় দুর্বলতা।

আইনি দীর্ঘসূত্রতা ও বিচারকের ভূমিকা

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফাহমিদা আক্তার বলেন, আইনে মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর সাজার বিধান থাকলেও এর যথাযথ প্রয়োগের অভাব রয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, যেমন ডেথ রেফারেন্স, আপিল, রিভিউ এবং রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার সুযোগ, অপরাধীর মনে এই আশা জাগিয়ে রাখে যে শেষ পর্যন্ত হয়তো তার ফাঁসি হবে না। এই দীর্ঘসূত্রতা ভুক্তভোগীর পরিবারকে মানসিক ট্রমার মধ্যে রাখে এবং অনেক সময় সাক্ষী বা প্রমাণের অভাবে অপরাধী জামিন পেয়ে মুক্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায়।

নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা

জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সভাপতি ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন যে, গণমাধ্যমে আলোচিত হলেই প্রশাসন সক্রিয় হয়, অথচ বিচারের ভিত্তি হওয়া উচিত অপরাধের গুরুত্ব। বিচার বিলম্বিত হলে ভুক্তভোগীরা প্রকৃত ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। ক্ষমতার প্রভাব, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, দুর্নীতি ও পক্ষপাতিত্ব তদন্তপ্রক্রিয়ার বড় বাধা, যা অনেক চাঞ্চল্যকর মামলাকেও বছরের পর বছর ঝুলে রাখে। প্রতিটি অপরাধের ক্ষেত্রে নির্মোহ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে অপরাধ প্রবণতা কমবে এবং আইনের শাসন শক্তিশালী হবে।