বিদেশে চিকিৎসার বিল বাবদ ৮২ লাখ টাকা নিয়েছেন উপদেষ্টা খালিদ

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা মাত্র আঠারো মাস দায়িত্বে ছিলেন। এই সময়ে তারা চিকিৎসার জন্য সরকারি কোষাগার থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন একাই চিকিৎসার বিল বাবদ ৮১ লাখ ৯১ হাজার ৪৮৮ টাকা নিয়েছেন। হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর সরকারি অনুমোদনেই তিনি গত বছরের শেষভাগে এবং চলতি বছরের শুরুর দিকে থাইল্যান্ডে চিকিৎসার জন্য যান। সেখানে তিনি অস্ত্রোপচার করান। তার প্রথম যাত্রায় সঙ্গে চিকিৎসক ছিলেন, আর পরের দফায় তার মেয়ে ও জামাতা সঙ্গে ছিলেন। খালিদ হোসেন জানিয়েছেন, তার এখনো শারীরিক সমস্যা রয়ে গেছে, তবে খরচের বিষয়টি অনেক বেশি হওয়ায় তিনি আর বিদেশে যেতে পারছেন না।

প্রতিবছর লাখ লাখ বাংলাদেশি চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমান। ২০২৪ সালের আগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মেডিকেল ট্যুরিজমের আওতায় প্রতিবছর ১৫ থেকে ১৭ লাখ বাংলাদেশি ভারতে যান। এ ছাড়া থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরেও বিপুলসংখ্যক মানুষ চিকিৎসার জন্য ভ্রমণ করেন। সরকারের এই বিপুল অর্থ ব্যয়ের প্রসঙ্গে খালিদ হোসেনকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, অতীতের সরকারগুলো কি স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে ব্যর্থ হয়েছে? উত্তরে তিনি অকপটে স্বীকার করেন যে নিশ্চয়ই ব্যর্থতা রয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন এত বছরেও মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের মতো মানসম্মত হাসপাতাল দেশে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। তার মতে, দেশে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলে এত টাকা খরচ করে বিদেশে যেতে হতো না। তিনি দাবি করেন, বিদেশে চিকিৎসা কোনো প্রমোদ ভ্রমণ নয়, বরং এটি তার একান্ত প্রয়োজন ছিল।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার পরেও স্বাস্থ্য খাত নিয়ে কেন প্রশ্ন তোলা হয়নি, এমন প্রশ্নে খালিদ হোসেন জানান, মন্ত্রী বা উপদেষ্টারা চাইলেই অনেক কিছু করতে পারেন না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। অন্তর্বর্তী সরকারের আঠারো মাসের শাসনামলে উপদেষ্টাদের মধ্যে বিদেশে চিকিৎসা বিল নেওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন, সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খানও রয়েছেন।

সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এ তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন। আঠারো মাসে বিদেশে চিকিৎসার জন্য তিনি সরকারি কোষাগার থেকে ৭৯ লাখ ৩৮ হাজার ২২৯ টাকা বিল তুলেছেন। ২০০৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব পালন করা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, তিনি সততার সঙ্গেই দায়িত্ব পালন করেছেন এবং শারীরিক জটিলতার কারণে দেশে রোগ নির্ণয় করা সম্ভব না হওয়ায় যথাযথ সরকারি অনুমোদন নিয়েই তিনবার সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিয়েছেন। উল্লেখ্য, তার নেতৃত্বেই ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হয়েছিল, যেখানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়।

তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন, যিনি ৮ লাখ ৭০ হাজার ৭৪৪ টাকা নিয়েছেন। এরপরে রয়েছেন সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ৭ লাখ ১৫ হাজার ৬৪৯ টাকা এবং বিদ্যুৎ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান ৫ লাখ ৩৯ হাজার ৯৩৫ টাকা। এছাড়া ভূমি উপদেষ্টা হাসান আরিফ ২ লাখ ৬৭ হাজার ২১৬ টাকা, শিক্ষা উপদেষ্টা ড. এম আমিনুল ইসলাম ২ লাখ ৩৫ হাজার ৭২৯ টাকা, খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার ১ লাখ ৭০ হাজার ১৩৪ টাকা চিকিৎসা বিল নিয়েছেন। পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদ উদ্দীন মাহমুদ ৬৭ হাজার ৩৬৭ টাকা, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ৩১ হাজার ৫২ টাকা, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান ২১ হাজার ৮০০ টাকা এবং প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টা শেখ মইনউদ্দিন ৪ হাজার ১৬০ টাকা সরকারি তহবিল থেকে গ্রহণ করেছেন।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান জানান, নিয়ম অনুযায়ী মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী মর্যাদার কেউ অসুস্থ হলে সরকার চিকিৎসা ব্যয় বহন করে এবং প্রয়োজনে বিদেশেও চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এটি কোনো মাসিক বা বার্ষিক ভাতা নয়। তিনি উল্লেখ করেন, অসুস্থতার প্রমাণ ও প্রয়োজনীয় বিল-ভাউচার দাখিল করা বাধ্যতামূলক। বিল বা ভাউচার ছাড়া অর্থ গ্রহণ করা সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত এবং যারা এটি অনুমোদন করেছেন তারাও অনিয়মের দায় এড়াতে পারেন না। ড. ইফতেখারুজ্জামান এ ঘটনার সুনির্দিষ্ট ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করে বলেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কী প্রক্রিয়ায় অর্থ ছাড় করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।