কেসিসিতে জ্বালানি তেল চুরির ঘটনা তদন্তে চার দফা কমিটি
খুলনা সিটি কর্পোরেশনের (কেসিসি) যানবাহন থেকে জ্বালানি তেল চুরির ঘটনা তদন্তের জন্য চার দফায় কমিটি গঠন করা হলেও এখনো পর্যন্ত তদন্তে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি সাধিত হয়নি। বারবার কমিটি পুনর্গঠন, সদস্য পরিবর্তন এবং কিছু ক্ষেত্রে বিতর্কিত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তির ঘটনা নগরভবনে নানা প্রশ্ন ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নতুন তদন্ত কমিটি গঠন
সর্বশেষ গত ২৪ মে কেসিসির সচিব রেজা রশীদ তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি নতুন তদন্ত কমিটি অনুমোদন করেন। এই কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে ভেটেরিনারি অফিসার ড. পেরু গোপাল বিশ্বাসকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন উপ-সহকারী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মোহাম্মদ সেলিমুল আজাদ এবং এস্টেট অফিসার গাজী সালাউদ্দীন।
পূর্ববর্তী কমিটি ও বাতিল
এর আগে গত ৪ মে তৃতীয় দফায় একটি কমিটি গঠিত হয়েছিল। সেই কমিটিতে নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মোহাম্মদ আনিচুজ্জামান আহ্বায়ক ছিলেন এবং সদস্য হিসেবে কনজারভেন্সি অফিসার মো. আনিসুর রহমান ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মোহাম্মদ সেলিমুল আজাদকে রাখা হয়েছিল। তবে বিভিন্ন কারণে সেই কমিটিও বাতিল হয়ে যায়।
ঘটনার সূত্রপাত ও প্রাথমিক পদক্ষেপ
কেসিসি সূত্রমতে, গত ১৯ মার্চ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে খালিশপুর বি-অঞ্চলের এসটিএস (সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন) সুপারভাইজার নুরুজ্জামান সুমন কেসিসির প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে মোবাইল ফোনে জানান যে, খালিশপুর নিউমার্কেট এসটিএসে একটি ব্যাক হুইল লোডারের জ্বালানি ট্যাংক থেকে তেল চুরি করা হচ্ছে। প্রশাসকের নির্দেশে ঘটনাস্থলে পৌঁছে কয়েক লিটার জ্বালানি তেলভর্তি একটি ক্যান জব্দ করা হয়। ঘটনার সঙ্গে জড়িত চালক এনায়েত হোসেন বাবলুকে সাময়িকভাবে গাড়ি চালানো থেকে বিরত রাখা হয়।
প্রাথমিকভাবে গঠিত কমিটিকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দুই মাসেরও বেশি সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও তদন্ত শেষ হয়নি।
বর্তমান কমিটির আশ্বাস
বর্তমান তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ড. পেরু গোপাল বিশ্বাস জানিয়েছেন যে, তিনি তদন্তসংক্রান্ত নথিপত্র পেয়েছেন এবং শিগগিরই তদন্তকাজ শুরু করবেন। তিনি আরও বলেন, বিধির বাইরে কোনো আবদার বা চাপ গ্রহণ করা হবে না।
তদন্ত কমিটি নিয়ে বিতর্ক
তদন্ত কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্কেরও সৃষ্টি হয়েছে। প্রথম দফার কমিটিতে থাকা এস্টেট অফিসার গাজী সালাউদ্দীনকে নিয়ে আপত্তি ওঠায় প্রশাসকের নির্দেশে তাকে বাদ দিয়ে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু সর্বশেষ কমিটিতে তাকে পুনরায় সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রশাসক নিজে যাকে একবার বাদ দিয়েছিলেন, তাকে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার কারণ নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
দ্বিতীয় দফায় গঠিত কমিটির সদস্য কনজারভেন্সি অফিসার (ক-অঞ্চল) মো. অহেদুজ্জামান ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করলে তদন্ত প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয় এবং তৃতীয় দফায় পুনরায় কমিটি গঠন করতে হয়।
অভিযোগ ও ঘটনার বিবরণ
কেসিসির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, চালক এনায়েত হোসেন বাবলুর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে যানবাহন থেকে জ্বালানি তেল চুরির অভিযোগ ছিল। এই অভিযোগগুলোর ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কর্মচারী নুরুজ্জামান সুমন তার ওপর নজরদারি শুরু করেন। নজরদারির একপর্যায়ে তাকে হাতেনাতে আটক করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, আটকের পর বাবলু আলামত নষ্ট করার উদ্দেশ্যে ড্রামভর্তি চুরিকৃত তেল ময়লার মধ্যে ঢেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় তেল সংরক্ষণের চেষ্টা করলে নুরুজ্জামান সুমনের ওপর হামলা চালানো হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, বাবলু ও তার সহকারী সুরুজ মিলে তাকে মারধর করেন।
রহস্য উদঘাটনে সংশয়
একের পর এক কমিটি গঠন ও পুনর্গঠনের ফলে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্তকরণ এবং দায় নির্ধারণ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
পূর্বের তদন্ত প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ
উল্লেখ্য, সাবেক মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মনির আমলেও কেসিসির দুই কর্মচারীকে দুই ড্রাম চোরাই তেলসহ আটক করা হয়েছিল। সে সময়ও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল, কিন্তু সেই তদন্ত প্রতিবেদন আজও প্রকাশ করা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, পুরোনো তদন্ত প্রতিবেদন পুনর্মূল্যায়ন করলে কেসিসির তেল চোর চক্রের নেপথ্যের চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।
জনগণের প্রত্যাশা
নগরবাসী ও কেসিসির সাধারণ কর্মচারীদের প্রত্যাশা, বারবার কমিটি পরিবর্তনের পরিবর্তে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এতে শুধু তেল চুরির ঘটনাই নয়, কেসিসির বিভিন্ন খাতে অনিয়মের অভিযোগও সামনে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
