এক সময় দেশের পাটশিল্পের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে পরিচিত খুলনার প্লাটিনাম জুবলী জুটমিল গত ছয় বছর ধরে উৎপাদনহীন অবস্থায় পড়ে আছে। দীর্ঘদিনের লোকসান, ঋণের বোঝা এবং সরকারি নীতির পরিবর্তনের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া এই রাষ্ট্রীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে পুনরায় সচল করার লক্ষ্যে এবার ইজারা নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী আরএফএল গ্রুপ। সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে টেন্ডারে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিরা ইতোমধ্যে মিল পরিদর্শনও সম্পন্ন করেছেন।
পুনরুজ্জীবনে আরএফএলের আগ্রহ
বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি) সূত্রে জানা গেছে, বিজেএমসির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার কবির উদ্দীন শিকদার আগামী বুধবার খুলনার খালিশপুর শিল্পাঞ্চলের উৎপাদনহীন মিলগুলো পরিদর্শনে যাবেন। এই পরিদর্শনের সময় তিনি স্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে মিলগুলোর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবেন। সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আরএফএল গ্রুপ প্লাটিনাম জুবলী জুটমিল ইজারা নেওয়ার জন্য টেন্ডারে অংশ নিয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন বিজেএমসির খুলনা অঞ্চলের সমন্বয়কারী এস এম মামুনুর রশিদ। তিনি আরও জানান, আগ্রহী প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিরা ইতোমধ্যে মিলের অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন।
মিলের দীর্ঘ ইতিহাস ও সংকট
ভৈরব নদের তীরে খুলনার শিল্পনগরী খালিশপুরে প্রায় ৫৫ একর জমির ওপর প্লাটিনাম জুবলী জুটমিলের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ১৯৫৫ সালে। বার্ষিক ৬১ হাজার মেট্রিক টন পাটপণ্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই মিলটির নির্মাণে সহযোগিতা করেছিল তৎকালীন পাকিস্তানের খ্যাতনামা শিল্পগোষ্ঠী আগা খান গ্রুপ। এর মূল উদ্যোক্তা ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন করপোরেশন।
পাকিস্তান আমলে আদমজী, বাওয়ানী ও ইস্পাহানী গোষ্ঠীর মতো আগা খান পরিবারও শ্রমিক স্বার্থ উপেক্ষা করার অভিযোগে সমালোচিত হয়েছিল। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় শ্রমিকরা প্রকাশ্যে এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। স্বাধীনতার পর বিদেশি অংশীদাররা দেশত্যাগ করলে, ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশ নং-২৭ অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার মিলটি জাতীয়করণ করে।
রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হলেও শুরু থেকেই নানা সংকটে জর্জরিত ছিল প্লাটিনাম জুবলী জুটমিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর লোকসানের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়তে থাকে। বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে প্রতিষ্ঠানটির ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪০ কোটি টাকা। অবশেষে লোকসান কমাতে ২০২০ সালের ১ জুলাই বিজেএমসি মিলটির উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে। এরপর থেকে মিল এলাকার বিশাল অবকাঠামো কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
সরকারি নীতি ও শ্রমিকদের ভিন্নমত
মিল বন্ধের পর থেকে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও সামাজিক সংগঠন রাষ্ট্রীয় মালিকানায় পুনরায় উৎপাদন চালুর দাবি জানিয়ে আসছে। এমনকি ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন এবং ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরাও বন্ধ মিল চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে এখন পর্যন্ত সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি।
দীর্ঘদিন লোকসানে থাকা রাষ্ট্রীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্জীবিত করার বিষয়ে বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আব্দুল মোক্তাদির চৌধুরী সম্প্রতি চীনের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক শেষে গণমাধ্যমকে জানান যে, উৎপাদনহীন মিলগুলোর অর্থনৈতিক কার্যকারিতা অনেকটাই হারিয়ে গেছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সম্পদের কার্যকর ব্যবহারের লক্ষ্যে এসব প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে মিল বেসরকারিকরণ নিয়ে শ্রমিক ও বামপন্থি রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। এ আসনের বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের প্রার্থী জনান্দন দত্ত নান্টু বলেন, সরকার পূর্বের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে। তাঁর মতে, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় সীমিত সংখ্যক শ্রমিক দিয়ে উৎপাদন চালিয়ে শিল্পপতিরা মুনাফা বাড়ানোর চেষ্টা করবেন, কিন্তু এতে শ্রমিকদের অধিকার ও কর্মসংস্থানের পূর্ণ নিশ্চয়তা মিলবে না।
এক সময় হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর থাকা খালিশপুর শিল্পাঞ্চল আজ অনেকটাই নিস্তব্ধ। প্লাটিনাম জুবলী জুটমিলের ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের পরিকল্পনার ওপর। আরএফএল গ্রুপের আগ্রহ নতুন আশার সঞ্চার করলেও শ্রমিকদের প্রত্যাশা—শুধু উৎপাদন চালু নয়, তাদের ন্যায্য অধিকার ও কর্মসংস্থানেরও নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
