ফুটবলে গোলশূন্য ড্রকে সাধারণত রোমাঞ্চকর বলা হয় না, কারণ গোলই এই খেলার প্রাণ। তবে এই প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে মাত্র ১৭১ বর্গমাইল আয়তনের ছোট্ট দেশ কুরাসাও। কোনো জয় ছাড়াই তারা লিখে ফেলেছে এক নতুন ইতিহাস। স্কোরবোর্ডে ০-০ ফলাফল থাকলেও, বিশ্বকাপের মঞ্চে সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে পয়েন্ট অর্জন করার পথে এটি কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
প্রশ্ন উঠতে পারে, গোলশূন্য ড্র কি সত্যিই উত্তেজনাপূর্ণ হতে পারে? পরিসংখ্যানের বিচারে এটি কেবল পয়েন্ট ভাগাভাগি। কিন্তু ফুটবল শুধু সংখ্যার খেলা নয়, এটি আবেগেরও এক ভাষা। আর সেই আবেগের ভাষাতেই কুরাসাও বনাম ইকুয়েডরের ম্যাচটি যেন এক মহাকাব্য রচনা করেছে।
এলয় রুমের ঐতিহাসিক সেভ
ম্যাচের ৮০তম মিনিটে ইকুয়েডরের বদলি খেলোয়াড় অ্যাঙ্গুলো বক্সের বাইরে থেকে এক রকেট গতির শট নেন। গ্যালারির হাজারো দর্শক যখন নিশ্চিত গোলের অপেক্ষায়, ঠিক তখনই যেন সময় থমকে যায়। এক নীল জার্সিধারী ছায়ামূর্তি শূন্যে ভেসে উঠে অবলীলায় বলটি ঠেকিয়ে দেন। তিনি ছিলেন কুরাসাওয়ের গোলরক্ষক এলয় রুম। এটি ছিল তার ১৫তম সেভ, যা বিশ্বকাপের ৯০ মিনিটের ম্যাচে সর্বোচ্চ সেভের নতুন রেকর্ড।
কে এই এলয় রুম?
৩৭ বছর বয়সী এলয় রুমের নাম হয়তো অনেকের কাছেই অপরিচিত। তিনি মায়ামি এফসি-র হয়ে খেলেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বিভাগ ইউএসএল চ্যাম্পিয়নশিপের একটি দল। এটি সেই সুপরিচিত মায়ামি দল নয় যা সাধারণত ফুটবলপ্রেমীদের মনে আসে। ইকুয়েডরের মতো শক্তিশালী দলকে রুখে দেওয়া এই গোলরক্ষক কোনো তারকাখচিত ক্লাবের খেলোয়াড় নন। তিনি এক অখ্যাত লিগের যোদ্ধা, যিনি জাতীয় দলের জার্সি পরলেই যেন এক অটল প্রাচীরে পরিণত হন।
আগের পারফর্ম্যান্স এবং বিশ্বমঞ্চে বিস্ফোরণ
তবে এমন বীরত্ব এলয় রুমের জন্য নতুন নয়। ২০১৯ সালের কনকাকাফ গোল্ড কাপেও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে একই ধরনের অসাধারণ পারফর্ম্যান্স দেখিয়েছিলেন। সেই ম্যাচে কুরাসাও ১-০ গোলে হারলেও, রুমের অতিমানবীয় খেলা দেখে এমএলএস দল কলম্বাস ক্রু দ্রুত তাকে দলে নেয়। ইকুয়েডরের বিপক্ষে এই রাতটি যেন তার সেই পারফর্ম্যান্সেরই দ্বিতীয় অধ্যায়। এটি বছরের পর বছর ধরে লালিত প্রতিভার এক বিস্ফোরণ, যা অবশেষে বিশ্বমঞ্চে আলোড়ন সৃষ্টি করল।
জয়ের চেয়েও বড় এই ড্র
তবে শুধু রুম একা তো ম্যাচ জেতান না; এই ম্যাচে তিনি জেতাননি, বরং ড্র করিয়েছেন। কিন্তু এই ড্র যেন জয়ের চেয়েও বড়। হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে এটি জয়ের চেয়েও বড় অর্জন। ক্যারিবিয়ান সাগরের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কুরাসাওয়ের জনসংখ্যা মাত্র দেড় লাখের সামান্য বেশি। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে, প্রথম ম্যাচে বড় হারের পর ইকুয়েডরের বিপক্ষে তারা যা করে দেখাল, তাকে কেবল একটি পয়েন্ট অর্জন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ এই ড্র ছোট্ট দ্বীপদেশটিতে নিশ্চয়ই এক জাতীয় উৎসবের জন্ম দিয়েছে। এটি এমন একটি মুহূর্ত, যা তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মও স্মরণ করবে।
সুতরাং, যখন কেউ প্রশ্ন করবে, গোলশূন্য ড্র কি রোমাঞ্চকর হতে পারে? উত্তর হবে, হ্যাঁ; যদি সেই শূন্যের পেছনে থাকে এমন সব অসাধারণ গল্প। স্কোরবোর্ড হয়তো ০-০ বলবে, কিন্তু কানসাস সিটির সেই রাতের গল্প বলবে ভিন্ন কিছু। এটি বিশ্বাস ফিরে পাওয়ার গল্প, এক প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার গল্প। আর সেই গল্পে গোল না হওয়াটাই যেন হয়ে উঠল সবচেয়ে বড় ‘গোল’, যে গোলটি আসলে কুরাসাও অর্জন করল।
