মেসির গোল উদ্‌যাপন: সাংবাদিক হোয়াকিন ব্রুনোর অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা

আর্জেন্টিনা ও অস্ট্রিয়ার মধ্যকার ম্যাচে তখন ৯৫তম মিনিট চলছিল। দলের জয় প্রায় নিশ্চিত, কেবল শেষ বাঁশির অপেক্ষা। ঠিক সেই মুহূর্তে লিওনেল মেসি নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে ফুটবলাররা সতীর্থদের দিকে অথবা কর্নার ফ্ল্যাগের দিকে ছুটে যান। তবে মেসিকে দেখা গেল ভিন্ন এক পথে। গোল করার পরপরই তিনি গোলপোস্টের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা এক সাংবাদিকের দিকে দৌড়ে যান এবং তার সঙ্গে হাত মেলান।

এই বিশেষ মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এরপরই শুরু হয় জল্পনা-কল্পনা—কে এই সাংবাদিক, যাঁর সঙ্গে মেসি তার গোল উদ্‌যাপন করলেন?

সেই সাংবাদিকের নাম হোয়াকিন ব্রুনো, যিনি আর্জেন্টিনার জনপ্রিয় ক্রীড়া চ্যানেল টিওয়াইসি স্পোর্টসের একজন প্রতিবেদক। ম্যাচের পর নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে ব্রুনো জানান যে, ঘটনাটি এখনো তার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে।

মেসির এই গোলটির আগে আর্জেন্টিনা ১-০ গোলে এগিয়ে ছিল। অস্ট্রিয়া বারবার আক্রমণ চালিয়ে সমতায় ফেরার চেষ্টা করছিল। ম্যাচের সেই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি স্মরণ করে ব্রুনো লিখেছেন, ‘স্নায়ুচাপ তখনো কাটেনি। ভেতরে-ভেতরে আবেগের ঢেউ চলছিল।’

সেই মুহূর্তে ব্রুনো গোলপোস্টের পেছনে একাই উপস্থিত ছিলেন। তার সহকর্মী গাস্তোন এদুল ম্যাচ-পরবর্তী সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য মিক্সড জোনে চলে গিয়েছিলেন। ৯৫তম মিনিটের সেই নাটকীয় মুহূর্তে প্রথমে হুলিয়ান আলভারেজ শট নেন, কিন্তু অস্ট্রিয়ার গোলরক্ষক আলেকজান্ডার শ্লাগার তা রুখে দেন। ফিরতি বলে মেসি শট নিলেও অস্ট্রিয়ার রক্ষণভাগ সেটিও ঠেকিয়ে দেয়। তবে তৃতীয় প্রচেষ্টায় আর্জেন্টাইন অধিনায়ক আর কোনো ভুল করেননি।

ব্রুনো তখন গোল হওয়ার স্থান থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে ছিলেন। গোলটি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেননি। টিওয়াইসিতে তিনি লিখেছেন, ‘পাগলের মতো চিৎকার করে উঠি, যেন আমি কোনো সাংবাদিক নই, আর্জেন্টিনারই একজন সমর্থক।’ এরপরই ঘটে সেই চমকপ্রদ ঘটনা।

ব্রুনোর নিজের ভাষায়, ‘দেখি, লিও আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমি তখনো চিৎকার করছি আর সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কাছে এসে আমার সঙ্গে হাত মিলিয়ে উদ্‌যাপন করল।’

এই ঘটনার পরপরই স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে টিওয়াইসি স্পোর্টসকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় ব্রুনো বলেন, ‘এখনো কাঁপছি, পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারিনি। লিও এসে এখানে দ্বিতীয় গোল উদ্‌যাপন করল, আমাকে চিৎকার করতে দেখে হাত মেলাল। বিশ্বাস করতে পারছি না। এটা আমার সাংবাদিক জীবনের সেরা দিনগুলোর একটি।’

কিছুক্ষণ পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্রুনো আরও একটি পোস্ট করেন, যেখানে তিনি লেখেন, ‘একজন আর্জেন্টাইন ফুটবলপ্রেমী, একজন মেসি–ভক্তের জন্য এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এই মুহূর্ত আর সেই ছবিটা আমি সারা জীবন মনে রাখব।’

তবে সেই মুহূর্তে তার মনে একটি দুশ্চিন্তা ছিল—সেই বিশেষ মুহূর্তের ছবি আদৌ পাওয়া যাবে কিনা। তাই তিনি সহকর্মীদের কাছে অনুরোধ করেছিলেন, ‘ছবিটা দরকার আমার, ছবিটা থাকতেই হবে।’ সৌভাগ্যবশত, ফটোগ্রাফাররা সেই মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দী করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ঘটনার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই তার ফোনে অসংখ্য বার্তা আসতে শুরু করে, যেখানে সবাই তাকে সেই ছবিটিই পাঠাচ্ছিলেন।

হোয়াকিন ব্রুনোর পরিচিতি

টিওয়াইসি স্পোর্টসের একটি পরিচিত মুখ হলেন হোয়াকিন ব্রুনো। তিনি আর্জেন্টাইন ক্লাব রেসিংয়ের খবর কাভার করার মাধ্যমে সাংবাদিকতা শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি জনপ্রিয় ফুটবল বিশ্লেষণমূলক অনুষ্ঠান ‘প্রেসিওন আলতা’র প্যানেলিস্ট হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেন।

এবারের বিশ্বকাপে টিওয়াইসি স্পোর্টসের হয়ে ব্রুনো আর্জেন্টিনা দলের প্রতিটি মুহূর্তের কাভারেজ করছেন। তবে বিশ্বকাপের তার সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তটি সম্ভবত কোনো সংবাদ প্রতিবেদনে নয়, বরং একটি ছবিতে ধরা থাকবে, যেখানে গোল করার পর বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি তার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছেন।