একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত রাসেল আহমেদের মতো চাকরিজীবীদের জন্য আগামী অর্থবছরের বাজেট নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসছে। বর্তমানে ১০ লাখ টাকা করযোগ্য আয়ের ওপর তাকে ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা আয়কর দিতে হয়। তবে প্রস্তাবিত নতুন কাঠামো অনুযায়ী, একই আয়ের ওপর তাকে ৪৮ হাজার ৭৫০ টাকা কর গুনতে হবে। অর্থাৎ করের বোঝা বাড়ছে ১১ হাজার ২৫০ টাকা বা প্রায় ৩০ শতাংশ। ১৫ লাখ টাকা করযোগ্য আয়ের ক্ষেত্রে করের পরিমাণ এক লাখ পাঁচ হাজার টাকা থেকে বেড়ে এক লাখ ৩০ হাজার টাকায় দাঁড়াবে, যা প্রায় ২৪ শতাংশ বৃদ্ধি। যখন মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি এবং বেতন সে হারে বাড়ছে না, তখন বাড়তি এই করের চাপ জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাওয়া মধ্যবিত্তের জন্য বড় সংকট হয়ে দাঁড়াবে।
জাতীয় বাজেট ২০২৫-২৬-এ ব্যক্তি-শ্রেণীর করমুক্ত আয়সীমা তিন লাখ ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি স্বস্তিদায়ক মনে হলেও কর কাঠামোর পরিবর্তন এই সুবিধা অনেকটা কমিয়ে দিয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, করযোগ্য আয়ের প্রথম এক লাখ টাকার ওপর করহার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ এবং পরবর্তী চার লাখ টাকার ওপর করহার ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। এর ফলে করমুক্ত সীমার সামান্য বৃদ্ধি সত্ত্বেও অধিকাংশ করদাতার ওপর করের সামগ্রিক চাপ বেড়ে গেছে।
কর বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বেসরকারি খাতে কর্মরতরাই এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শিকার। শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসাভাড়া ও নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে তারা এমনিতেই আর্থিক চাপের মুখে রয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে বাড়তি কর তাদের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলবে। এছাড়া কর রেয়াতের ক্ষেত্রেও নতুন শর্ত আরোপ করা হয়েছে। আগে করযোগ্য আয়ের ২০ শতাংশ বিনিয়োগে রেয়াত পাওয়া গেলেও এখন তা বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করা হয়েছে এবং রেয়াতের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে সঞ্চয় ও বিনিয়োগে আগ্রহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ব্যাংকার রাসেল আহমেদের মতো অনেকেরই দীর্ঘদিনের ক্ষোভ সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের কর বৈষম্য নিয়ে। বেসরকারি কর্মীদের ক্ষেত্রে মূল বেতনের পাশাপাশি অন্যান্য ভাতাও করযোগ্য আয়ের অন্তর্ভুক্ত, যা সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে অনেক ক্ষেত্রে করমুক্ত থাকে। অর্থনীতিবিদদের অভিমত, রাজস্ব আহরণ জরুরি হলেও শুধুমাত্র বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করলে তা হিতে বিপরীত হতে পারে। কর ফাঁকি রোধ ও প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির বদলে করদাতাদের ওপর বাড়তি বোঝা চাপানো দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, কর ব্যবস্থাকে আরও মানবিক ও ভারসাম্যপূর্ণ করতে মূল্যস্ফীতির বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। করমুক্ত আয়সীমা আরও বৃদ্ধি, সরকারি-বেসরকারি খাতের কর বৈষম্য দূর করা এবং নতুন করদাতা তৈরির মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নিলে তা আরও কার্যকর হতো। বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না বাড়িয়ে বরং কর রেয়াতের সুবিধাকে যৌক্তিক পর্যায়ে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
