বাংলা একাডেমি এবং পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) বাংলা বিভাগের যৌথ আয়োজনে কবি মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকার স্মরণে এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন-১ এর গ্যালারী-২ এ এই সেমিনারটি আয়োজিত হয়।
সেমিনারে বিশিষ্টজনদের উপস্থিতি
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পাবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মোহাম্মদ শামীম। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান ও মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মীর হুমায়ুন কবীর। বিভাগের শিক্ষকদের মধ্যে অধ্যাপক ড. এম আব্দুল আলীম, সহযোগী অধ্যাপক ড. তানভীর হায়দার, সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল ইসলাম, সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মাদ নূরুন্নবী এবং খণ্ডকালীন প্রভাষক আরিফা বিশ্বাস উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. গিয়াস শামীম ও সহকারী অধ্যাপক জোবায়ের আবদুল্লাহ, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মো. রুহুল আমীন এবং বাংলা একাডেমির গবেষণা কর্মকর্তা মামুন সিদ্দিকীও সেমিনারে অংশ নেন। পাবনার বিভিন্ন কবি, সাহিত্যিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এই আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনা ও প্রবন্ধ উপস্থাপন
সেমিনারের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন সেমিনার উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. এম আব্দুল আলীম। এরপর, কবি মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকার জীবন ও কর্মের ওপর প্রবন্ধ পাঠ করেন পাবিপ্রবির বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তানভীর হায়দার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জোবায়ের আবদুল্লাহ।
প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. গিয়াস উদ্দিন। এছাড়াও আলোচনায় অংশ নেন সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মো. রুহুল আমীন এবং বাংলা একাডেমির গবেষণা কর্মকর্তা মামুন সিদ্দিকী।
বক্তাদের গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য
অধ্যাপক ড. এম আব্দুল আলীমের স্বাগত বক্তব্য
স্বাগত বক্তব্যে অধ্যাপক ড. এম আব্দুল আলীম বলেন, তিনি কবি মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা যে শহরে সাহিত্য সাধনা করেছেন, ঠিক সেই শহরেই বাস করেন। এমনকি কবির বাসস্থানের পাশেই তার নিজের বাসা ছিল। তবে মহাকালের বিধানে একশো বছরের পরিক্রমায় কবির স্মৃতিবিজড়িত সেই বাড়িটি এখন আর নেই। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাড়িটি না থাকলেও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ও সংস্কৃতি জগতে তার কীর্তি উজ্জ্বল হয়ে আছে। অধ্যাপক আলীম বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ১৯২০ ও ৩০-এর দশকে পাবনা শহর থেকে একজন নারী কলকাতার আলবার্ট হলে গিয়ে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেছেন। বনমালী ইনস্টিটিউট, শিপলাই জমিদার বাড়ি, অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরি এবং পাবনা টাউন হলের মতো জায়গায় অনুষ্ঠিত সাহিত্য আসর ও সম্মেলনে মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা মধ্যমণি হয়ে আসন গ্রহণ করেছেন। ১৯২৫ সালে মহাত্মা গান্ধী যখন পাবনা শহরে এসেছিলেন, তখন তার সভায় একমাত্র মুসলিম নারী হিসেবে মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা উপস্থিত ছিলেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাজনীতি, সাহিত্য ও সংস্কৃতি—সব জগতেই এই মহীয়সী নারীর সরব উপস্থিতি ছিল। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, নতুন প্রজন্ম মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকার দেখানো আলোর শিখা প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দেবে এবং এই আয়োজনের জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, বাংলা একাডেমি ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান।
অধ্যাপক ড. মীর হুমায়ুন কবীরের সভাপতির বক্তব্য
সেমিনারের সভাপতি ও বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মীর হুমায়ুন কবীর তার বক্তব্যে বলেন, বাংলা বিভাগে বাংলা একাডেমির এই আয়োজন সত্যিই বিভাগের জন্য একটি গৌরবের বিষয়। তিনি বাংলা একাডেমির উপ-পরিচালক ইমরুল ইউসুফকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান, যিনি প্রতি মুহূর্তে তার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। অধ্যাপক কবীর জানান, বাংলা একাডেমি ইতিমধ্যে জানিয়েছে যে, সেমিনারে পঠিত দুটি প্রবন্ধ তারা গ্রহণ করবে এবং সম্ভবত বাংলা একাডেমির স্মারক গ্রন্থে এই দুটি লেখা স্থান পাবে। এর মাধ্যমে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় একটি ঐতিহাসিক জায়গা তৈরি করতে পেরেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, এই অনুষ্ঠানের সৌন্দর্য আরও বর্ধন করেছে শিক্ষার্থীরা এবং পাবনা জেলার সুধী সমাজ, যারা বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত ও গুরুত্বপূর্ণ।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মোহাম্মদ শামীমের প্রধান অতিথির বক্তব্য
প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মোহাম্মদ শামীম বলেন, কোনো জাতির অগ্রযাত্রা কেবল রাজনৈতিক ইতিহাসের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না; সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং জ্ঞানচর্চাও সেই যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। তিনি উল্লেখ করেন, একজন সাহিত্যিক তার সময়কে ধারণ করেন, সমাজের মনস্তত্ত্বকে প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা ছিলেন তেমনই একজন সাহিত্যিক, যিনি তার সময়কে অতিক্রম করে আজও আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিক। উপাচার্য বলেন, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ ছিল পরিবর্তনের যুগ। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, নারীশিক্ষার প্রসার এবং সামাজিক সংস্কারের নানা ধারা তখন সমাজকে নতুনভাবে রূপান্তরিত করছিল। কিন্তু সেই সময়ে মুসলিম নারীদের সাহিত্যচর্চা ছিল অত্যন্ত সীমিত ছিল। সামাজিক রক্ষণশীলতা, শিক্ষার অপ্রতুলতা এবং পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা তাদের পথকে কঠিন করে তুলেছিল। এই প্রতিকূল বাস্তবতায় মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা কলম হাতে তুলে নিয়েছিলেন। তিনি শুধু সাহিত্য রচনা করেননি, বরং একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছিলেন। তার জীবন আমাদের শেখায় যে জ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীলতার শক্তি সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করতে পারে। তিনি বাংলা সাহিত্যে মুসলিম নারী লেখকদের অগ্রপথিকদের অন্যতম। তার কবিতায় মানবতা, দেশপ্রেম, নৈতিকতা, সৌন্দর্যবোধ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের এক অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়। তার সাহিত্যকর্ম আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সাহিত্য কেবল আবেগের প্রকাশ নয়, এটি সমাজকে দেখার এবং সমাজকে বদলে দেওয়ার একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
