পাইকগাছায় গণপিটুনিতে একজনের মৃত্যু, উত্তেজিত জনতার হামলা ও অগ্নিসংযোগ

পাইকগাছায় গণপিটুনিতে একজনের মৃত্যু

খুলনার পাইকগাছায় গণপিটুনিতে হাসান কিং (৩৫) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। গত ৭ জুন, রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে উপজেলার চাঁদখালী পশুর হাটে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। নিহত হাসান চাঁদখালীর মালেক সরদারের ছেলে। গণপিটুনির কারণ নিয়ে দুটি ভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। পশুর হাটের ইজারাদারের দাবি, হাটের টাকা ছিনতাইয়ের সময় হাসান কিংকে গণপিটুনি দেওয়া হয়। অন্যদিকে, নিহতের পরিবারের অভিযোগ, বাজারে এক মহিলার সামনে প্রস্রাব করাকে কেন্দ্র করে দলবদ্ধভাবে পিটিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে।

পুলিশ মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিহতের পরিবার ইজারাদারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং তার লোকজনের বসতবাড়িতে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে বলে ইজারাদার ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার অভিযোগ করেছে। বর্তমানে এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

গণপিটুনির বিস্তারিত বিবরণ

পশুর হাটের আদায়কারী আজহারুল ইসলাম ঘটনার দিনের বর্ণনা দিয়ে বলেন, হাট শেষ হওয়ার পর তিনি ব্যাগে করে হাটের টাকা নিয়ে ইজারাদার নাজমুল হুদা মিন্টুর বাজার সংলগ্ন অফিসে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে পশু হাটের কোণায় পৌঁছানোর পর হাসান কিং তাকে আঘাত করে টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এসময় তিনি চিৎকার করলে আশেপাশের লোকজন জড়ো হয়ে হাসানকে গণপিটুনি দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ডাঃ অয়ন কুমার সরকার জানান, রাত ৯টার দিকে হাসপাতালে আনার পর তার শরীরে কোনো পালস পাওয়া যায়নি। হাসপাতালের এই চিকিৎসক আরও বলেন, হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছিল। খবর পেয়ে ওই রাতেই থানার এসআই আজিজুর রহমান হাসপাতালে গিয়ে মৃতের সুরতহাল রিপোর্ট করেন।

নিহতের পরিবারের পাল্টা অভিযোগ

নিহতের চাচা আব্দুল গফফার বলেন, তারা বাজারের উপরে বসবাস করেন। ঘটনার দিন আব্দুল কুদ্দুস বাড়ির এক মহিলার সামনে প্রস্রাব করাকে কেন্দ্র করে লোকজন দলবদ্ধ হয়ে তার ভাইপো হাসানকে পিটিয়ে গুরুতর জখম করে। হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন। কিশোরী মীমও এই ঘটনার ন্যায়বিচার দাবি করেছেন।

গণপিটুনির জেরে হামলা ও অগ্নিসংযোগ

এদিকে, নিহতের এই ঘটনার জেরে ওই রাতেই এবং সোমবার ভোরে নিহতের পরিবারের লোকজন ইজারাদার নাজমুল হুদা মিন্টুর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং কালিদাসপুর গ্রামের আব্দুল কুদ্দুসের বসতবাড়িতে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে বলে সরেজমিনে গিয়ে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন।

  • নাজমুল হুদা মিন্টু বলেন: হাসানের পরিবারের লোকজন রাতে এবং সকালে আমার অফিস ও হ্যাচারিতে হামলা করে। এসময় তারা বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে।
  • আব্দুল কুদ্দুস মোড়লের স্ত্রী পারভীন বেগম বলেন: সোমবার ভোরে হাসানের পরিবারের লোকজন আমার এবং দেবর ইমরানের বসতবাড়িতে হামলা করে ফ্রিজ এবং পানির ট্যাংকসহ বসতবাড়ির সব আসবাবপত্র ভাংচুর করে আগুন ধরিয়ে দেয়। এসময় অগ্নিসংযোগ করতে নিষেধ করলে তারা প্রতিবেশী আসাদুল ইসলামকে মারপিট করে।

নিহত হাসানের পূর্ব পরিচয়

স্থানীয়দের মতে, নিহত হাসান কিংয়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। আব্দুর রাজ্জাক বলেন, হাসান মাদকের কারবার ও চুরি সহ এমন কোনো খারাপ কাজ নেই যা করতো না। এর আগেও এলাকার মানুষ তাকে দুইবার গণধোলাই দিয়েছিল বলে তিনি জানান। এলাকার ব্যবসায়ী আলহাজ্ব খোকন গাজী বলেন, হাসান এলাকায় চিহ্নিত চোর হিসেবে পরিচিত ছিল। তার কর্মকাণ্ডে এলাকাবাসী অতিষ্ঠ ছিল। সে নারীদেরও উত্যক্ত করতো এবং তার কাছে চাঁদা চেয়েছিল বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

পুলিশের বক্তব্য ও বর্তমান পরিস্থিতি

এ প্রসঙ্গে থানার ওসি গোলাম কিবরিয়া বলেন, মৃতদেহ উদ্ধার করে সোমবার সকালে ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। নিহত হাসানের নামে থানায় মাদক ও চুরি সংক্রান্ত একাধিক মামলা রয়েছে। তবে এই ঘটনায় থানায় এখনো কেউ কোনো অভিযোগ করেনি বলে তিনি জানান। ঘটনার পর থেকে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এলাকায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।