যুক্তরাষ্ট্র-ইরান মধ্যস্থতায় পাকিস্তানের লাভ কী?

সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকে গত সপ্তাহে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান বিন জসিম আল-থানির পাশে দেখা গেছে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে। সে সময় ঘটনাস্থলের খুব কাছেই উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। নিজের বক্তব্য শুরু করার সময় ভ্যান্স সরাসরি মুনিরের দিকে ইঙ্গিত করে রসিকতা করে বলেন, তার জীবনে দুজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি আছেন—একজন ভারতীয় এবং একজন পাকিস্তানি। ভারতীয় ব্যক্তিটি তার স্ত্রী এবং পাকিস্তানি ব্যক্তিটি হলেন ফিল্ড মার্শাল মুনির। জেডি ভ্যান্স জানান, তার স্ত্রী উষা ভ্যান্স একজন ভারতীয় অভিবাসী দম্পতির সন্তান। এছাড়া গত তিন মাসে তিনি জেনারেল মুনিরের সঙ্গে অন্য যেকোনো ব্যক্তির চেয়ে বেশি কথা বলেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশংসার পুনরাবৃত্তি করে ভ্যান্স বলেন, মুনিরের দূরদর্শিতা ও সামরিক নেতৃত্ব না থাকলে তারা আজ এই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারতেন না।

ওয়াশিংটনের এই উচ্চকণ্ঠ প্রশংসা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। গত সোমবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ইসলামাবাদে এক রাষ্ট্রীয় সফরে আসেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসনের পর এটি ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর। এই সফরে তিনি ওয়াশিংটন ও তেহরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে সহযোগিতার জন্য পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানান। এই সফরটি পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, গত চার মাসে তেহরানের কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশে ইসলামাবাদ কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গত ১৮ জুন শান্তিচুক্তির বিষয়ে যে সমঝোতা হয়েছে এবং যে ৬০ দিনের আলোচনা চলমান রয়েছে, তা মূলত পাকিস্তানের এই মধ্যস্থতারই ফসল। দেশটি পর্দার আড়ালে যোগাযোগ স্থাপন, ইসলামাবাদে বৈঠকের আয়োজন এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে এই রাজনৈতিক ঝুঁকি গ্রহণ করেছে।

তবে এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, এই পুরো প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের প্রকৃত লাভ কী? দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য এই উত্তর পাওয়া জরুরি। গত অর্থবছরে পাকিস্তান ৩ দশমিক ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, যা চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এছাড়া প্রবাসী আয় ৮ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ৩ হাজার ৩০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং রাজস্ব ঘাটতিও কমেছে। তবে লাহোরভিত্তিক অর্থনীতিবিদ হিনা শেখের মতে, এই চিত্র পুরোপুরি আশাব্যঞ্জক নয়। তিনি বলেন, এই মধ্যস্থতা খুব সীমিত অর্থনৈতিক সুবিধা দিতে পারে, যেমন হরমুজ প্রণালি খুলে গেলে জ্বালানি খরচ কমা অথবা ইরান-পাকিস্তান গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পে গতি আসা। তার মতে, সাম্প্রতিক এই প্রবৃদ্ধি উৎপাদন বৃদ্ধির ফল নয়, বরং হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় তেল-গ্যাস আমদানি কমে যাওয়ার ফল।

পাকিস্তান বর্তমানে আইএমএফের ৭০০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির অধীনে রয়েছে, যা ২০২৪ সালে অনুমোদিত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, ভালো কূটনৈতিক সম্পর্কই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বড় বিনিয়োগ বা অর্থনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পর ওয়াশিংটনকে সহায়তা করেও পাকিস্তান বড় কোনো অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটাতে পারেনি। তবে হিনা শেখ মনে করেন, এই সুসম্পর্ক পাকিস্তানকে কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার সুযোগ দেবে, যা দেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের গতি বাড়াতে কাজে লাগানো যেতে পারে। নীতিনির্ধারকদের মতে, দ্বিপক্ষীয় সুযোগের চেয়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে বেলুচিস্তান সীমান্ত দিয়ে বাণিজ্য পুনরায় শুরু হতে পারে এবং গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পেও নতুন প্রাণ ফিরতে পারে।

রিয়াদভিত্তিক গবেষক উমর করিমের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন যখন অন্য কোনো মধ্যস্থতাকারীকে বিশ্বাস করছিল না, পাকিস্তান সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছে। তবে পাকিস্তানের প্রভাবের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। দেশটি ইরানকে বড় ধরনের ছাড় দিতে বাধ্য করা বা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কোনো শর্ত আরোপের মতো অবস্থানে এখনো পৌঁছায়নি। পর্যালোচকদের চোখে, এই পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান সুবিধা পেয়েছে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী। সেনাপ্রধান, বিশেষ করে ফিল্ড মার্শাল মুনিরকে দেশটির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। তবে এই কূটনৈতিক সাফল্যের সুফল যদি সাধারণ মানুষের কাছে না পৌঁছায়, তবে তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে। অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার তুঘরাল ইয়ামিনের মতে, এর আসল পরীক্ষা হবে তখন, যখন এর অর্থনৈতিক সুফল বেলুচিস্তানের মতো দরিদ্র ও সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে পৌঁছাবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, অর্থনৈতিক সুফল প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারলেই দীর্ঘস্থায়ী সন্ত্রাসবাদ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।