পাতারটেকে সাতজন হত্যার ঘটনায় শেখ হাসিনাসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে শুনানি

গাজীপুরের পাতারটেকে ‘জঙ্গি নাটক’ সাজিয়ে সাতজনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১০ আসামির বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আবেদন জানিয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানি শেষ করেছে প্রসিকিউশন। রোববার (২ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে এই আবেদন করা হয়।

প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি পরিচালনা করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। তার সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ, সহিদুল ইসলাম সরদার, আবদুস সাত্তার পালোয়ান, মামুনুর রশিদ ও মার্জিনা রায়হান। শুনানিতে প্রসিকিউটর তামিম অভিযোগের বিবরণ দিয়ে বলেন, শেখ হাসিনার সরকারের আমলে দেশজুড়ে একই পদ্ধতিতে অপরাধ সংঘটিত হতো। ভিন্ন দলমত বা ইসলামী মতাদর্শকে নির্মূলে গুম-খুনের মতো বিচারবহির্ভূত হত্যার একটি ভীতিকর সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছিল। সে সময় এমপি-মন্ত্রীদের নিয়ে কোনো কিছু লেখা অসাধ্য ছিল এবং কারও বিরুদ্ধে কথা বললেই বিভিন্ন বাহিনীর গোপন বন্দিশালায় গুম করে রাখা হতো।

প্রসিকিউটর তামিম বলেন, গুমের শিকার অনেক পরিবারের সদস্যরা বাধ্য হয়ে বলতেন, ‘আমার ছেলেকে জেলে দিন, তবু ক্রসফায়ারে দেবেন না’। এরপরও অনেক মানুষকে বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে হত্যা করে লাশ নদীনালা কিংবা সড়কের পাশে ফেলে রাখা হতো। তিনি উল্লেখ করেন, আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপিরা শুধু জঙ্গি জঙ্গি বলে বক্তব্য দিতেন এবং বিশ্বকে জানান দিতে চাইতেন যে এ দেশে জঙ্গি ভরা। অথচ বিচারবহির্ভূত এসব হত্যাকাণ্ডকে মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বিদেশি সংস্থা প্রতিবেদন দিয়েছিল।

পাতারটেকে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রসিকিউশন জানায়, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সাতজনকে তুলে নিয়ে বগুড়ায় পুলিশের একটি গোপন বন্দিশালায় আটকে রাখা হয়। ২০১৬ সালের ৮ অক্টোবর গাজীপুরের নোয়াগাঁও পাতারটেক এলাকায় সোলায়মান সরকারের বাড়িতে তাদের নেওয়া হয়। এরপর কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের নেতৃত্বে ‘অপারেশন শরতের তুফান’ নামে জঙ্গি নাটক সাজিয়ে সাতজনকেই গুলি করে হত্যা করেন সোয়াত সদস্যরা। প্রসিকিউটর তামিম আরও বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বলপূর্বক গুম করে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল।

প্রসিকিউশন জানায়, হত্যাযজ্ঞ শেষেই ক্ষান্ত হয়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সাতজনের লাশ নিতে এলে পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও তদন্ত করা হবে বলে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। এ ভয়ে কেউই সাহস করেননি। নিহতদের মধ্যে চারজনের পরিচয় এখনও অজানা। বাকি তিনজন হলেন মো. ইবরাহীম, ফরিদুল ইসলাম আকাশ ও সাইফুর রহমান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর ইবরাহীমের বাবা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দেন।

মামলার অন্য আসামিরা হলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, তৎকালীন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহীদুল হক, তৎকালীন এসবি প্রধান ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তৎকালীন কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া, তৎকালীন সিটিটিসি ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম, বগুড়ার তৎকালীন পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান, গাজীপুরের তৎকালীন পুলিশ সুপার ও ডিবিপ্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ, বগুড়ার তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুর রহমান মণ্ডল এবং তৎকালীন সিটিটিসির সহকারী পুলিশ কমিশনার (টিম লিডার, সোয়াট) এসএম জাহাঙ্গীর হাছান। বর্তমানে এ মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন শহীদুল হক ও আসাদুজ্জামান মিয়া এবং তাদের আজ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে।

এদিকে, ডিসচার্জ চেয়ে শুনানির জন্য সময় চেয়েছেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। আইনজীবী সিফাত মাহমুদ শুভ জানান, তারা প্রসিকিউশন থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেরিতে পেয়েছেন, তাই প্রস্তুতির জন্য সময় প্রয়োজন। প্রসিকিউশন এতে আপত্তি না জানানোয় ট্রাইব্যুনাল আগামী ১০ আগস্ট আসামিপক্ষের শুনানির জন্য দিন ধার্য করেছেন। চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি এই ১০ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। এরপর অভিযোগ আমলে নিয়ে পলাতকদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল-১।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত