তিস্তা মহাপরিকল্পনা: তারেক রহমানের চীন সফরে চুক্তি সম্ভাবনা

তিস্তা মহাপরিকল্পনা: দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কর্তৃক তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে এ অঞ্চলের কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে তিস্তা সেচ প্রকল্পের সূচনা হয়েছিল। বর্তমানে তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে তিস্তা মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে। দীর্ঘ ৫০ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে উত্তরাঞ্চলের ৫ জেলার মানুষের স্বপ্ন পূরণে সরকার উদ্যোগী হয়েছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে এতদিনকার সিদ্ধান্তহীনতা দূর হয়েছে, যেখানে ভারত না চীন—এই দোটানা ছিল। ফ্যাসিবাদী ও ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম পছন্দ ছিল ভারত।

চীনের সঙ্গে অর্থায়ন ও সমীক্ষা

সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য চীনের কাছে অর্থায়ন চাওয়া হয়েছে। চীনও আগে থেকেই প্রস্তুত থেকে এই বিষয়ে কাজ করছে এবং নতুন করে সমীক্ষার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে এনেছে। তবে, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এখনো পুরো প্রকল্পের ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) তৈরির কাজ সম্পন্ন করতে পারেনি। আশা করা হচ্ছে, শিগগিরই একনেক সভায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রকল্পটি পাশ হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই তিস্তা প্রকল্পকে একটি অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করছেন।

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তি

আগামী ২৫ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন। এর পরের দিন তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। চীন সফরকালে প্রধানমন্ত্রী লিয়াওনিং প্রদেশের দালিয়ানে ২৩ থেকে ২৫ জুন অনুষ্ঠিতব্য ‘নিউ চ্যাম্পিয়নস’-এর ১৭তম বার্ষিক সম্মেলনে (সামার দাভোস ফোরাম) অংশ নেবেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৫ থেকে ১৭টি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ), দুটি চুক্তি, একটি অ্যাকশন প্ল্যান এবং একটি প্রটোকল অন্তর্ভুক্ত। একই সঙ্গে বহুল আলোচিত তিস্তা প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হবে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনার সম্ভাব্য সুফল

চীনের সঙ্গে এসব চুক্তি বাস্তবায়িত হলে তিস্তার দুই পাড়ে স্যাটেলাইট শহর গড়ে উঠবে। এর ফলে ৫৪ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, ১৪ হাজার কোটি টাকার জমি পুনরুদ্ধার হবে এবং বছরে ২০ হাজার কোটি টাকার ফসল উৎপাদন সম্ভব হবে। ভূ-উপরিস্থ সেচের পানি সরবরাহের মাধ্যমে বছরে ২৭ কোটি টাকার জ্বালানি এবং ১২ কোটি টাকার সার সাশ্রয় হবে, যা কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। চীনের সঙ্গে তিস্তা চুক্তির বিষয়টি সামনে আসায় উত্তরাঞ্চলের ৫ জেলার মানুষ প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, এই নতুন উদ্যোগ তাদের জেলার মানুষের স্বপ্ন পূরণে অত্যন্ত সহায়ক হবে।

জনগণের দাবি ও মানববন্ধন

এদিকে, গতকাল শনিবার সকালে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটির আয়োজনে নগরীর কাচারী বাজারসহ রংপুরের ১৪টি স্থানে একযোগে মানববন্ধন ও সমাবেশ কর্মসূচি পালিত হয়। এই কর্মসূচি থেকে তিস্তা মহাপরিকল্পনার পরিবর্তে অন্য কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নে উদ্যোগ না নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, বর্তমান সরকার নির্বাচনের আগে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। তাই তারা অবিলম্বে একনেক সভায় তিস্তা মহাপরিকল্পনার প্রকল্প পাসসহ কাজ শুরুর দাবি জানান। রংপুর মহানগরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক মোড় থেকে শাপলা চত্বর পর্যন্ত ১০টি পয়েন্টে একযোগে এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। কর্মসূচিতে তিস্তাপাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, নদীভাঙন, পানিসংকট, কৃষি ও জীবিকা সংকটের বিষয়গুলো তুলে ধরে অবিলম্বে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরুর দাবি জানানো হয়।

প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি ও প্রকল্পের বিস্তারিত

জানা গেছে, ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ অঞ্চলের মানুষকে তিস্তার দুঃখ দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষায় তিনি ইতোমধ্যে একাধিক কমিটি গঠন করেছেন। তিস্তা নদীর বাংলাদেশ অংশে দৈর্ঘ্য ১১৫ কিলোমিটার, যার মধ্যে ৪৫ কিলোমিটার ভাঙনপ্রবণ এবং প্রায় ২০ কিলোমিটারের পরিস্থিতি ভয়াবহ। এই মহাপরিকল্পনার আওতায়:

  • ১০৮ কিলোমিটার নদী খনন করা হবে।
  • নদীর দুপাড়ে তীর রক্ষাকাজ ও চর খনন করা হবে।
  • দুই পাড়ে স্যাটেলাইট শহর নির্মাণ করা হবে।
  • ১৪ হাজার কোটি টাকার জমি পুনরুদ্ধার হবে।
  • ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা পাবে।
  • প্রতি বছরে ২০ হাজার কোটি টাকার ফসল উৎপাদন হবে এবং হাজার হাজার বাড়িঘর রক্ষা পাবে।

তিস্তা সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতি মৌসুমে রংপুর অঞ্চলে ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে ভূ-উপরিস্থ সেচের পানি সরবরাহ করে ২৭ কোটি টাকার জ্বালানি এবং ১২ কোটি টাকার সার সাশ্রয় হয়েছে। তিস্তা সেচ প্রকল্পের মোট ব্যয় ১ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। এর মাধ্যমে এক লাখের বেশি হেক্টর জমি সেচ সুবিধার আওতায় আসবে, ফলে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন ধান এবং ৫ লাখ মেট্রিক টনের বেশি অন্যান্য খাদ্যশস্য উৎপাদন বাড়বে, যার বর্তমান বাজারমূল্য এক হাজার কোটি টাকা। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সচিব সভায় জানিয়েছে, এর পাশাপাশি ৮৬ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এছাড়া, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অধিকতর উন্নীতকরণ, পরিবেশ তথা জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং প্রকল্প এলাকায় বসবাসরত ৪৫ লাখ জনগণের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি হবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ভারত থেকে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত পানির আর প্রয়োজন হবে না। নদীর গভীরতা প্রায় ১০ মিটার বৃদ্ধি পাবে এবং সারা বছর নৌচলাচলের মতো পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। এতে ভারত থেকে পানি চুক্তির প্রয়োজন হবে না। প্রস্তাবনায় নৌপথ চালুর ব্যবস্থা, সেনা ক্যাম্প ও থানা গড়ে তোলার কথাও রাখা হয়েছে।

প্রকল্পের মডেল ও অগ্রগতি

পূর্ব চীনের জিয়াংসু প্রদেশের সুকিয়ান সিটির আদলে তিস্তার দুই পাড়ে পরিকল্পিত স্যাটেলাইট শহর, নদী খনন ও শাসন, ভাঙন প্রতিরোধ ব্যবস্থা, আধুনিক কৃষি সেচ ব্যবস্থা, মাছ চাষ প্রকল্প (যা থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা আয় হবে), পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন এবং ৪৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ব্যবস্থার মাধ্যমে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। ‘তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট এ্যান্ড রেস্টোরেশন’ নামে একটি প্রকল্প সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার পরিকল্পনা কমিশন থেকে ইআরডিতে পাঠিয়েছিল। চায়না পাওয়ার কোম্পানি কয়েক বছর ধরে তিস্তাপাড়ের নির্মিতব্য প্রকল্প বাস্তবায়নে নকশা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শেষ করেছে। নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর ও গাইবান্ধা—তিস্তা নদীর পাড়ের এই জেলাগুলোতে চীনের তিনটি প্রতিনিধি দল কাজ করছে।

বিশেষজ্ঞের মন্তব্য

‘তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট এ্যান্ড রেস্টোরেশন’ প্রকল্পের সাবেক পরিচালক ও প্রধান প্রকৌশলী আজিজ মুহাম্মদ চৌধুরী ইনকিলাবকে বলেন, “তিস্তার নদী খনন, নদীর দুপাড়ে তীর রক্ষাকাজ, চর খনন, দুই পাড়ে স্যাটেলাইট শহর নির্মাণ, ১৪ হাজার কোটি টাকার জমি পুনরুদ্ধার, ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা এবং প্রতি বছরে ২০ হাজার কোটি টাকার ফসল উৎপাদন এবং হাজার হাজার বাড়িঘর রক্ষা পাবে।” তিনি আরও বলেন, এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে ভারত থেকে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত পানির আর চুক্তির প্রয়োজন হবে না। পানি উন্নয়ন বোর্ড পৃথক প্রজেক্ট আকারে কাজ বাস্তবায়ন করবে এবং শিগগিরই টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু হবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হলে এই জেলাগুলোর বর্তমান চিত্র রাতারাতি পাল্টে যাবে, আজীবনের জন্য অভাব দূর হবে এবং মঙ্গা দুর্নাম থেকে মুক্ত হবে।

অর্থায়নের সর্বশেষ অবস্থা

উত্তরাঞ্চলের ৫ জেলার মানুষের স্বপ্ন পূরণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সিদ্ধান্তহীনতার অবসান ঘটেছে। কর্মসূচি বাস্তবায়নে চীনের কাছে ৫৫ কোটি ডলার বা ৬ হাজার ৭১০ কোটি টাকার ঋণ চাওয়া হয়েছে। চীনও এটি নিয়ে কাজ করছে, তবে প্রকল্প প্রস্তাব এখনো পরিকল্পনা কমিশনের হাতে আসেনি।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী বলেন, “আমরা ঋণ চেয়েছি। কিন্তু কোনো আপডেট আছে কিনা সেটি সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত সচিবের সঙ্গে কথা বলতে হবে। এই মুহূর্তে কোনো আপডেট আছে কিনা সেটি আমার জানা নেই।”

চীনের ‘কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট’-এ অর্থায়নের জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় গত বছরের ২৬ মে পরিকল্পনা কমিশনে একটি চিঠি পাঠায়। চিঠিতে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের ঋণের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। পরে জুলাইয়ে ইআরডি চীনা দূতাবাসে চিঠি পাঠায়। এই চিঠিতে বলা হয়, তিস্তা প্রকল্পের প্রথম পর্যায় বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৭৫ কোটি ডলার বা প্রায় ৯ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে চীনের কাছ থেকে ৫৫ কোটি ডলার বা ৬ হাজার ৭১০ কোটি টাকা ঋণ চাওয়া হয়েছে। বাকি টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে। প্রক্রিয়াকরণ শেষে প্রকল্পের ডিপিপি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পেলে ২০২৬ থেকে ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে এটি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করবে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে চীনের একটি প্রস্তাব ছিল, যা বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলার মানুষের ভাগ্য বদলে যাবে। শুষ্ক মৌসুমে পানির জন্য ভারতের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না। নদীর গভীরতা প্রায় ১০ মিটার বাড়বে এবং বন্যার পানি প্লাবিত হয়ে গ্রামগঞ্জের জনপদ ভাসাবে না। সারা বছর নৌচলাচলের মতো পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা যাবে। এতে ১০৮ কিলোমিটার নদী খনন, নদীর দু’পাড়ে ১৭৩ কিলোমিটার তীর রক্ষা, চর খনন, নদীর দুই ধারে স্যাটেলাইট শহর নির্মাণ, বালু সরিয়ে কৃষিজমি উদ্ধার ও ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা এবং প্রতি বছরে ২০ হাজার কোটি টাকার ফসল উৎপাদনের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত। নৌ-বন্দর এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দুই পাড়ে থানা, কোস্ট গার্ড ও সেনাবাহিনীর জন্য ক্যাম্পের ব্যবস্থার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।

তিস্তা নদীর ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

প্রায় ২৪০ বছরের পুরোনো নদী তিস্তা। এর সঙ্গে উত্তরের ২৫টি নদীর প্রবাহ রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে নদীটি একেবারেই শুকিয়ে যায়। নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম জেলার রাজাহাট, উলিপুর, চিলমারী, রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা এবং গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে নদীটি। তবে শুষ্ক মৌসুমে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয় রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলা। এ উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের মধ্যে সাতটিই তিস্তা নদীবেষ্টিত। নদীশাসন না হওয়ায় গত পাঁচ বছরে এর গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে।

স্মারক চুক্তি ও ভাঙন পরিস্থিতি

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং চীনের পাওয়ার কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশন অব চায়না বা পাওয়ার চায়নার মধ্যে ২০১৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। মহাপরিকল্পনায় পূর্ব চীনের জিয়াংসু প্রদেশের সুকিয়ান সিটির আদলে তিস্তার দুই পাড়ে পরিকল্পিত স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলার প্রাথমিক প্রস্তাব করা হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সূত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশ অংশে তিস্তা নদীর দৈর্ঘ্য ১১৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৪৫ কিলোমিটার ভাঙনপ্রবণ। বিশেষ করে প্রায় ২০ কিলোমিটারের পরিস্থিতি ভয়াবহ। কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট, উলিপুর ও চিলমারী উপজেলা অংশে টানা ভাঙন হয়। লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধাতেও ভাঙন রয়েছে। ভাঙন প্রতিরোধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।

পানি সম্পদ মন্ত্রীর আশ্বাস

গত শুক্রবার রংপুরের কাউনিয়ায় তিস্তা সেতু এলাকা পরিদর্শন শেষে পানি সম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেছেন, শিগগিরই একনেক সভায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রকল্পটি পাশ হবে। তবে বিশেষজ্ঞ টিমের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে কাজ শুরু হবে। প্রধানমন্ত্রী এই প্রকল্পকে অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে বিবেচনায় নিয়েছেন, তাই তিস্তাপাড়ের বাসিন্দাদের আর কোনো চিন্তা নেই। শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তিস্তা নদীকে ঘিরে মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছেন। সম্পূর্ণ দেশীয় অর্থায়নে এবং দেশি-বিদেশি কারিগরি সহযোগিতায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই তিস্তা মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। বিশেষ প্রকল্পের আওতায় প্রয়োজনীয় অর্থায়নের মাধ্যমে এটি বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে এবং প্রধানমন্ত্রী নিজেই এই কাজের সার্বিক অগ্রগতি তদারকি করছেন। তিনি বলেন, “আমরা যদি খুব পরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ করি, পরিকল্পিত ড্রেজিং করি তাহলে এই অঞ্চলের মানুষকে ইনশাআল্লাহ রক্ষা করতে সক্ষম হবো।” পানি সম্পদ মন্ত্রী আরও বলেন, তিস্তাপাড়ের সকল দিক বিবেচনা করলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা খুবই প্রয়োজন। “তিস্তা শুধু আপনাদের (লালমনিরহাট, রংপুর) দুঃখ না, এটা সারা বাংলাদেশের দুঃখ। আমরা যখনই এ কাজগুলো দৃশ্যমান করে সমাপ্ত করতে পারব, হয়তো ২-৪ বছর বা ৬-৭ বছর সময় লাগবে। কিন্তু এর সুফল এ অঞ্চলের মানুষ পাবে, সারা বাংলাদেশের অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। অর্থনীতির ভিত মজবুত হবে। এখানে কৃষি উপকরণ এবং কৃষিভিত্তিক অঞ্চল গড়ে উঠবে, যেটা আপনাদের এ অঞ্চলের পাঁচটা জেলার দুঃখ, তা আনন্দে পরিণত হবে।”