বাংলাদেশে ৬.৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে আগ্রহী জাপান

জাপান সফরের দ্বিতীয় দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে টোকিওতে তার কার্যালয় ‘কান্তেই’-এ এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। এই বৈঠকে দুই নেতা বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও উঁচুতে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তাদের আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ‘কৌশলগত অংশীদারিত্বে’ উন্নীত করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের বিষয়টি উঠে আসে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের অংশীদারিত্ব কয়েক দশকের বন্ধুত্ব, আস্থা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে।

বৈঠকে বাংলাদেশের জ্বালানি, অবকাঠামো এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে ১ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা প্রায় ৬.৩ বিলিয়ন ডলার বেসরকারি বিনিয়োগের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে জাপান-টেক পার্ক প্রতিষ্ঠা, ছয়টি বিভাগীয় শহরে দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক নির্মাণ, দেশব্যাপী উড়াল সড়ক তৈরি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রস্তাব তুলে ধরেন। পাশাপাশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, আধুনিক যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা এবং শিল্পায়নে সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের বড় অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে সমুদ্র পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, উপকূলীয় টহল ও বন্দরের নিরাপত্তায় সহযোগিতা বাড়ানোর কথা জানিয়েছে জাপান। তিনি বলেন, শান্তিপ্রিয় দেশ জাপান ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রথম দিকেই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানকারী দেশগুলোর অন্যতম। এই বিনিয়োগের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দ্রুত বাংলাদেশে জাপানি প্রতিনিধিদল পাঠানোর বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়।

নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রেও দুই দেশ পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের অঙ্গীকার করেছে। এরই অংশ হিসেবে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তরবিষয়ক চুক্তি সই ও কার্যকর হওয়াকে দুই প্রধানমন্ত্রী স্বাগত জানিয়েছেন। উপকূলীয় নিরাপত্তা বাড়াতে জাপানের সরকারি সহায়তায় একটি টহলজাহাজ দেওয়ার বিষয়টি যৌথ ঘোষণায় নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে ‘বিগ-বি’ উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও তারা একমত হয়েছেন। এ ছাড়া জাপানের সরকারি নিরাপত্তা সহায়তা কর্মসূচির আওতায় পাঁচটি টহলবোট দেয়ার কথা বলা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ কর্মসূচির আওতায় আরও সহযোগিতার সুযোগ খোঁজার অঙ্গীকারও করেছেন তারা।

অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে বাংলাদেশ ও জাপানের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে একাধিক সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এর মধ্যে জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মধ্যে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নের চুক্তি অন্যতম। পাশাপাশি খাদ্য, কৃষি, মৎস্য ও পশুপালন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় আলাদা দুটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে।

সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের শিল্প স্থাপনা পরিদর্শন করেন। মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বিকাল পৌনে ৫টায় তিনি চিবা প্রিফ্যাকচারের ইচিকাওয়া শহরে নিটসু লজিস্টিকস হাব পরিদর্শন করেন। এর আগে দুপুর আড়াইটায় তিনি ফুতসু শহরে জেরা’র (JERA) স্থলভিত্তিক তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘুরে দেখেন। এসব পরিদর্শনের সময় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং পররাষ্ট্র ও জ্বালানি খাতের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তার সঙ্গে ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন এ কথা জানান। মঙ্গলবার জাপানের স্থানীয় সময় বিকাল পৌনে ৫ টায় চিবা প্রিফ্যাকচারের ইচিকাওয়া শহরে অবস্থিত নিটসু লজিস্টিকস হাব তিনি পরিদর্শন করেন। জাপানের চিবায় অবস্থিত নিটসু লজিস্টিক হাব মূলত নিপ্পন এক্সপ্রেস কোম্পানির অধীনে পরিচালিত একটি অত্যন্ত আধুনিক ও কৌশলগত মাল্টি-মডেল লজিস্টিক কেন্দ্র। এই দুই পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির। আসিফ আসাদ, ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. শাকিরুল ইসলাম খান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানকে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, দুই দেশের এই বন্ধুত্বকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও যৌথ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করাই সরকারের লক্ষ্য। তিনি জাপানি ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিদ্যমান সুযোগ কাজে লাগানোর আহ্বান জানান। আতিথেয়তার জন্য জাপানের প্রধানমন্ত্রী ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তারেক রহমান জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। বাংলাদেশে বিদ্যমান বিনিয়োগের সুযোগগুলো অনুসন্ধান করতে এবং আমাদের উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে অংশীদার হতে আমি জাপানি বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তরিকভাবে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আমরা একসঙ্গে কাজ করলে আমাদের দুই মহান দেশের জন্য আরও সহনশীল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারবো। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে জাপান বাংলাদেশের অন্যতম মূল্যবান উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি ও অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। আমরা এই দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের জন্য গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।

বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মিৎসুইসহ জাপানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক এবং বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক ফোরামের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের অভিন্ন লক্ষ্য আরও সুদৃঢ় হয়েছে বলে দুই পক্ষই আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।