রাজধানীর কাজীপাড়ায় কর্মরত ওয়াসিউর রহমান একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর অধীনে কর্মরত অন্তত ২০ কর্মীর তদারকি ও মাঠপর্যায়ের কাজের জন্য তাঁকে সারাদিন ব্যস্ত থাকতে হয়। যাতায়াত, গ্রাহক বৈঠক ও করপোরেট পরিবেশ বজায় রাখার পেছনে তাঁর বেতনের বড় একটি অংশ খরচ হয়ে যায়। বছরের শেষে প্রাপ্ত বেতন বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় প্রতি মাসেই তাঁকে চরম আর্থিক টানাপোড়েনের মুখোমুখি হতে হয়। প্রতিদিন তাঁকে ঢাকার রাস্তায় ঘুরতে হয়, নানা খাতের গ্রাহকদের সঙ্গে বৈঠক করতে হয় এবং মাঠপর্যায়ের কাজের তদারকি করতে হয়। কিন্তু বছর শেষে যে পরিমাণ বেতন মেলে, তা বাজারদরের সঙ্গে কোনোভাবেই খাপ খায় না। মাস শেষে হিসাব মেলাতে গিয়ে পকেটে টান পড়ে তাঁর। তিনি জানান, লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় টানা যাতায়াত এবং দুপুরে বাইরে খাওয়ার পেছনেই তাঁর বেতনের একটি বড় অংশ চলে যায়। ইনক্রিমেন্টের খাতা ইতিবাচক দেখালেও কেনাকাটার বাজারে গিয়ে কর্মী প্রতিদিন এই আয়ের ঘাটতি টের পাচ্ছেন। বেসরকারি খাতে নির্দিষ্ট কোনো কেন্দ্রীয় বেতনকাঠামো না থাকায় কোম্পানিভেদে বেতনের তফাত বিশাল। কিন্তু আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, সংকটের ব্যাপ্তি এখন আর নির্দিষ্ট কোনো পদে সীমাবদ্ধ নেই। অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশে অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতির পেছনে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত ব্যর্থতা অন্যতম ভূমিকা রেখেছে।
ওয়াসিউর রহমানের মতো দেশের কোটি কোটি বেসরকারি চাকরিজীবী আজ নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি ও চাকরির নিজস্ব বাড়তি খরচের চাপে অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছেন। মিরপুরের একটি প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগে কর্মরত মধ্যম সারির এক কর্মকর্তা জানান, অফিসের প্রাতিষ্ঠানিক মান ও সামাজিক অবস্থান ধরে রাখার অদৃশ্য চাপের পাশাপাশি সন্তানের শিক্ষা ও মা-বাবার চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে মাসের শেষে হাতে কোনো সঞ্চয় থাকছে না। বিসিএসে ‘রিপিট ক্যাডার’ বন্ধে যে উদ্যোগ পিএসসির, ৫০তম থেকেই মিলতে পারে সুফল। সহজ কথায়, উপার্জনের তুলনায় নিত্যদিনের খরচের বাড়বাড়ন্তই সাধারণ মানুষকে চাপে ফেলছে। নীতিগত ব্যর্থতা ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ।
বেসরকারি খাতে এই আর্থিক সংকটের মূল কারণ হিসেবে অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ, মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতি থেকে শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশীয় পয়েন্ট পিছিয়ে রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে সংকুচিত করে দিচ্ছে। কয়েক বছর ধরে সাধারণ মানুষের আয় যে গতিতে বেড়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে তার চেয়ে অনেক দ্রুতগতিতে। কানাডায় পিএইচডি শিক্ষার্থীদের জন্য ৮ হাজার ২০০ কোটি টাকার বৃত্তি, পাবেন ৫০ জন।
মাঠপর্যায়ে কাজ করা কর্মীদের অবস্থা আরও শোচনীয়। উত্তরায় একটি বায়িং হাউসের জুনিয়র কর্মী সোহেল রানা জানান, রোদে-বৃষ্টিতে ঘুরে কাজ করার বিপরীতে প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত যাতায়াত ভাতা অত্যন্ত অপ্রতুল। ফলে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে তাঁকে পকেট থেকে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
বিগত পাঁচ বছরের অর্থনৈতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ১৫ শতাংশ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ এবং ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ।
পাঁচ বছরে সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৫২ শতাংশ। হিসাব অনুযায়ী, পাঁচ বছর আগের ২০ হাজার টাকার পণ্য কিনতে এখন প্রায় ৩০ হাজার ৪০০ টাকা প্রয়োজন। অথচ নিয়মমাফিক বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পেলেও একজন কর্মীর প্রকৃত আয়ের ঘাটতি থাকছে প্রায় ২ হাজার ৯০০ টাকা। তিনি প্রতিবছর গড়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা (প্রতিষ্ঠানভেদে কমবেশি হতে পারে) করে ইনক্রিমেন্ট পেয়েছেন। ফলে তাঁর বর্তমান মূল বেতন দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৫০০ টাকা।
বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চড়া মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি স্থবির হয়ে পড়েছে। এদিকে, বেসরকারি খাতে মাত্র ১০ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান থাকায় মালিকপক্ষ অতিরিক্ত শ্রমিকের জোগান কাজে লাগিয়ে নামমাত্র বেতন বাড়াচ্ছে।
এই সংকট মোকাবিলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সানেমের গবেষণা পরিচালক মাহতাব উদ্দিনের পরামর্শ হলো, বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বাধীনভাবে সুদের হার ও রেপো বাড়িয়ে কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, সরকারের বড় বড় অনাবশ্যক প্রকল্প বন্ধ করা প্রয়োজন। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটের সময় অন্যান্য দেশ কঠোর মুদ্রানীতি নিলেও বাংলাদেশে টাকা ছাপিয়ে ব্যাংক বাঁচানো এবং ক্রমাগত বাজেটের আকার বড় রাখা হয়েছে।
আমদানিকৃত ফলের মতো খাদ্যপণ্যের শুল্ক ১০০ শতাংশ থেকে ৫-১০ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানোর তাগিদ দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ন্যূনতম মজুরি, বাধ্যতামূলক বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট প্রবিধান ও শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ সৃষ্টির ওপর জোর দিয়েছেন এই অর্থনীতিবিদ। পর্যাপ্ত দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমেই কেবল প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বাড়িয়ে কর্মীদের দর-কষাকষির সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

