অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে শীর্ষে দক্ষিণ আফ্রিকা, সিরিজের সেরা জানসেন

অস্ট্রেলিয়াকে তিন টেস্টের সিরিজে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে আইসিসি টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর স্থান দখল করেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। ২০১৬ সালের জানুয়ারির পর এই প্রথম তারা এই টেস্ট চূড়ায় পৌঁছাল। শেষ টেস্টে ২৮৮ রানের লক্ষ্য তাড়ায় নেমে অস্ট্রেলিয়া মাত্র ১১১ রানে অলআউট হয়ে যায়। এর ফলে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের তালিকায় দক্ষিণ আফ্রিকা দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে, আর সিরিজ শুরু করার সময় শীর্ষে থাকা অজিরা পিছিয়ে যথাক্রমে দুই ও তিন নম্বরে নেমে গেছে।

নিউল্যান্ডসে টেস্ট ও সিরিজ জয়ের পর দক্ষিণ আফ্রিকার তারকা অলরাউন্ডার মার্কো জানসেনের কাছে স্বস্তি ও উত্তেজনার অনুভূতি তুলে ধরেন। শনিবার সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, জয়ের আগের রাতে উদ্বেগে তার প্রায় ঘুমই হয়নি। তার ভাষায়, “আমি হয়তো দেড় থেকে দুই ঘণ্টার মতো ঘুমিয়েছি। বারবার জানলা দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছিলাম, আর ভাবছিলাম আমাদের কী করা দরকার বা পরিস্থিতি আমাদের বিপক্ষে গেলে কী হবে।”

তবে ম্যাচ শেষে দলের এই সাফল্য তাকে দারুণ আনন্দ দিয়েছে। জানসেন বলেন, “আমরা যখন সঠিক ফলাফলে পৌঁছাই, তখন এক মুহূর্তের জন্য স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি যে শেষ পর্যন্ত কাজটা হয়েছে। এরপরই মনে আসে এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি। আমি ভালো খেলি কিংবা না খেলি, দলের জয়ে অবদান রাখতে পারাটা মাঠের ভেতরে বা বাইরে—একটি সম্মিলিত বিষয়। এটি কোনো ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, তাই আনন্দটা অনেক বেশি।”

নিউল্যান্ডস টেস্টের প্রথম ইনিংসে জানসেন ৫২ রান করার পাশাপাশি ৬০ রান দিয়ে ৩টি উইকেট নেন। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে মিচেল স্টার্কের বাউন্সারে আউট হয়ে ৮ বলে শূন্য রানে ফেরেন এবং শেষ ইনিংসে ৮ ওভার বল করে ১৭ রান দিয়ে কোনো উইকেট পাননি। তবে পুরো সিরিজে ব্যাট ও বলে অনবদ্য অবদান রাখায় তাকে ‘প্লেয়ার অফ দ্য সিরিজ’ নির্বাচিত করা হয়।

সিরিজের টার্নিং পয়েন্ট ছিল সেন্ট জর্জ পার্কে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচ। ডারবানের কিংসমিডে প্রথম টেস্টে ২১৪ রানের বড় ব্যবধানে হেরে পিছিয়ে পড়েছিল প্রোটিয়ারা। এর ওপর বৃষ্টি ও ভেজা মাঠের কারণে দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম দুই দিনের সিংহভাগ সময় নষ্ট হয়। সেখানে দল যখন ১১০ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছিল, তখন জানসেন ১০০ বলে ৮৫ রানের ইনিংস খেলে দলকে খেলায় ফেরান এবং পরে ৩৩ রানে ৫ উইকেট নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ইনিংস ও ৩১ রানে ম্যাচ জেতান।

সিরিজের চাপ এবং মাঠের ওঠানামা নিয়ে জানসেন বলেন, “সিরিজটি মোটেও সহজ ছিল না। নাটকীয় মোড় ছিল পদে পদে। কোনো দলই টানা আধিপত্য ধরে রাখতে পারেনি। নিউল্যান্ডসে ড্রেসিংরুমে বসে একসময় মনে হচ্ছিল আমরা জয়ের দিকে এগোচ্ছি, কিন্তু পরপর চার উইকেট পড়ে যাওয়ার পর মনে হচ্ছিল—আমরা এসব কী করছি!”

সিরিজের দুর্দান্ত নৈপুণ্য জানসেনকে টেস্টের এক নম্বর বোলার এবং শীর্ষ অলরাউন্ডার বানিয়ে দিয়েছে। তবে নিজেকে বিশেষ কিছু ভাবতে রাজি নন ২৫ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার। তিনি বলেন, “আমি নিজেকে ক্লার্কসডর্পের সেই সাধারণ ছেলে বলেই মনে করি। প্রোটিয়াদের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু করার সময় শীর্ষ ১০-এ থাকার কথা চিন্তাও করিনি। এখন সেখানে নিজের নাম দেখে রোমাঞ্চ লাগে। আমার বাবা সবসময় বলতেন—‘কখনও মাথা গরম বা অহংকারী হবে না।’ আমি সবসময় মনে রাখি কোথা থেকে এসেছি।”

তিনি আরও যোগ করেন, “আট বছর আগে আমি হাইস্কুলে পড়ার সময় টিভিতে এই তারকাদের খেলা দেখতাম। আর আজ কেপটাউনে হাজারো মানুষ আমার খেলা দেখছে। মাঠের ভেতরের চাপ সামলে শান্ত ও সংযত থাকাটাই আমার মানসিক উন্নতির বড় প্রমাণ।”

অধিনায়ক টেম্বা বাভুমা পুরো সিরিজটিকে “রোমাঞ্চকর ১৫ দিনের ক্রিকেট” এবং “১৫ দিনের ধারাবাহিক চাপ” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, “এক অদ্ভুত কিন্তু সুন্দর উপায়ে আমরা নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য লড়াই করেছি। আড়াই বছর আগে আমরা যে আজ এই অবস্থানে পৌঁছাব, তা হয়তো নিজেও ভাবিনি।”

দলের কোচ শুকরি কনরাডের ভিন্নধর্মী ভাবনার প্রশংসা করে বাভুমা বলেন, “শুকরি অনেক অদ্ভুত ও সাহসী ফর্মুলা ব্যবহার করেন। সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করতে আমি তাকে প্রশ্ন করি। তবে দল হিসেবে আমরা যে সিদ্ধান্তই নিই না কেন, শতভাগ আত্মবিশ্বাস নিয়ে তার পাশে থাকি।” দীর্ঘ লড়াই ও উত্তেজনার ইতি টেনে এখন চ্যাম্পিয়ন দল স্বস্তির ঘুম ঘুমাতে পারে।