মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে গত ৩১ অক্টোবর প্রথম টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে আট উইকেটে হেরেছে বাংলাদেশ। আইসিসি ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন বাস্তবায়নে স্পিন-সহায়ক উইকেট বানিয়ে সফরকারীদের পরাস্ত করার কৌশল নিয়েছিল স্বাগতিকরা। তবে সেই পরিকল্পনা কার্যকর হয়নি; বরং ওয়েস্ট ইন্ডিজই স্পিন কৌশলে পুরো আধিপত্য দেখিয়েছে।
উইকেটে ক্যারিবিয়ান স্পিনারদের আধিপত্য
ম্যাচজুড়ে সফরকারী স্পিনাররা দারুণ প্রভাব বিস্তার করেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বাঁহাতি স্পিনার জোমেল ওয়ারিক্যান প্রথম ইনিংসে পাঁচ উইকেটসহ ম্যাচে মোট নয়টি উইকেট নেন। পরবর্তীতে দ্বিতীয় ইনিংসে অফস্পিন দিয়ে পাঁচ উইকেট শিকার করেন ক্যারিবিয়ান অধিনায়ক রস্টন চেজ, যা ব্যাটারদের জয়ের পথ সহজ করে দেয়।
টার্নের পার্থক্যে ফুটে ওঠা বিস্ময়
দুই দলের স্পিনারদের বোলিংয়ের ধরন ছিল ভিন্ন। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনাররা উইকেটে গড়ে ৩.৫ ডিগ্রি টার্ন আদায় করেছেন, অথচ বাংলাদেশের স্পিনাররা পেয়েছেন গড়ে ৩.০ ডিগ্রি টার্ন। ঘরের মাঠে এমন তুলনামূলক কম টার্ন আদায় করতে পারা দলটিকে নতুন প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
মিরপুর টেস্ট শেষে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ দলের টিম ম্যানেজমেন্টের এক সদস্য ক্রিকবজকে বলেন, “আমি জানি না আমরা কেন বল টার্ন করানো ভুলে গেছি। যদি এই উইকেটেও বল টার্ন করাতে না পারি, তবে কোথায় পারব তা নিয়ে আমি নিশ্চিত নই।”
বোলিং গতি ও টেকনিকের প্রভাব
তিনি আরও যোগ করেন, “এটা কোনো কারিগরি বিষয় নাকি অন্য কিছু তা নিশ্চিত নই, কারণ এই স্পিনাররাই সমতল উইকেটে আরও ভালো টার্ন করাতেন। আমার মনে হয় আমাদের বোলাররা বেশি গতিতে বোলিং করার চেষ্টা করেছিলেন, অন্যদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলাররা ধীরগতিতে বল করেছিলেন। সম্ভবত সেই কারণে তারা আমাদের চেয়ে বেশি টার্ন পেয়েছেন।”
আক্রমণাত্মক মানসিকতার অভাব ও প্ল্যান-বি
বাংলাদেশের স্পিনারদের মানসিকতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ম্যানেজমেন্টের ওই সদস্য জানান, সাধারণ ধারায় স্বাগতিক স্পিনাররা রান আটকে রেখে চাপ সৃষ্টির দর্শন মেনে খেলেন। কিন্তু টেস্টে শুধু রান আটকানোর মানসিকতা যথেষ্ট নয়।
- “আমরা সাধারণত আক্রমণাত্মক স্পিনার নই; আমরা বিশ্বাস করি রান আটকানো গেলে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে এবং আমাদের বেশিরভাগ স্পিনার এই মানসিকতা নিয়ে খেলেন।”
- “আমাদের কোনো বিকল্প পরিকল্পনা বা প্ল্যান-বি থাকে না। ম্যাচের মাঝামাঝি এসে হুট করে তাদের খেলার ধরন বদলে ফেলা সম্ভব নয়।”
- “তবে এখন আমাদের বিকল্প পরিকল্পনা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে যাতে প্রয়োজনে আক্রমণ করা যায়। আর সেটার মানে হলো উইকেট শিকারের জন্য সাহসী হওয়া।”
- “কম রান ডিফেন্ড করার সময় এই কৌশল সঠিক হতো কি না তা নিয়ে তর্ক হতে পারে, কিন্তু শুধু রান আটকানোর মানসিকতা দিয়ে এত ছোট লক্ষ্য রক্ষা করা যায় না।”
পেসারদের উপেক্ষা ও পেছনের কৌশল
সাম্প্রতিক সময়ে মিরপুরে স্পিনবান্ধব উইকেট তৈরি করার কৌশল জয়ের চেয়ে হারের সংখ্যাই বাড়িয়েছে। দলের পেসাররা সম্প্রতি ভালো পারফর্ম করা সত্ত্বেও তাদের ওপর বিশ্বাস না রাখা নিয়ে সমালোচনা উঠেছে। চোটের কারণে সিরিজের বাইরে থাকা নাহিদ রানার অনুপস্থিতিও স্পিন-নির্ভর উইকেটের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে।
সিলেটে পরবর্তী টেস্ট ও সামনে ভাবনার খোরাক
ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক জয়ের পর টানা পরাজয়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে আগামী ৫ নভেম্বর সিলেটে শুরু হতে যাওয়া দ্বিতীয় টেস্টের আগে বাংলাদেশকে বোলিং কৌশল ও পিচ তৈরি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।

