সরকার ফেনী জেলাকে আকস্মিক বন্যার কবল থেকে সুরক্ষিত রাখতে ১ হাজার ৫৪২ কোটি টাকার একটি বিশাল প্রকল্প হাতে নিয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ‘ফেনী জেলাধীন মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (১ম পর্যায়)’ নামের এই প্রকল্পটি আজ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পেতে যাচ্ছে। এই সংবাদে ফেনী এবং এর পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষের মধ্যে আনন্দের ঢেউ বইছে।
এই প্রকল্পের আওতায় ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি কমাতে শক্তিশালী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হবে। একই সাথে মুহুরী, কহুয়া এবং সিলোনিয়া নদীর সার্বিক উন্নয়ন সাধন করা হবে। মঙ্গলবার (১৬ জুন) অনুষ্ঠিতব্য একনেক বৈঠকে প্রকল্পটি উপস্থাপনের কথা রয়েছে। অনুমোদন লাভ করলে চলতি বছর (২০২৬) থেকে ২০৩১ সালের জুন মাসের মধ্যে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) এটি বাস্তবায়ন করবে।
রাজধানীর সচিবালয়ে আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারম্যান তারেক রহমান সভাপতিত্ব করবেন। আজকের একনেক সভায় এই প্রকল্পসহ মোট পাঁচটি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।
প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ও প্রত্যাশিত সুফল
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এই প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য হলো আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যা নিয়ন্ত্রণে বাপাউবোর বিদ্যমান বাঁধগুলোকে আরও শক্তিশালী করা। এছাড়াও নদী খননের মাধ্যমে সেগুলোর পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করে বন্যা ব্যবস্থাপনার পরিধি বাড়ানো এবং প্রকল্প এলাকার নিষ্কাশন ব্যবস্থার টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
এসব কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রকল্প এলাকার সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামো এবং কৃষিজমিসহ আনুমানিক ১৪ হাজার ২০৯ কোটি টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পত্তি সুরক্ষিত থাকবে। এর পাশাপাশি, প্রতি বছর বন্যা থেকে ৩ লাখ ৭১ হাজার ৭৩৫ টন ধান ও অন্যান্য শস্য, ১৫ টন মৎস্যসম্পদ এবং ২৫ টন পোলট্রি রক্ষা করা সম্ভব হবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতামত
এ প্রসঙ্গে সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন-আল-রশীদ সাংবাদিকদের বলেন, "তাড়াহুড়ো না করে কারিগরি সমীক্ষা ভালোভাবে সম্পন্ন করেই এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত। কারণ পাহাড়ি ঢল প্রতিরোধের জন্য বাঁধগুলো এমনভাবে শক্ত ও টেকসই করে নির্মাণ করতে হবে, যেন প্রতি বছর সেগুলো ভেঙে হাজার কোটি টাকার অপচয় না হয়।"
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, মুহুরী, কহুয়া এবং সিলোনিয়া নদীর অনেক স্থানে প্রশস্ততা কমে যাওয়ায় এবং নদীগুলোর পানি ধারণক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে উজান থেকে নেমে আসা আকস্মিক বন্যার পানি ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
মূলত, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ফেনী জেলা এবং ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে অবিরাম বর্ষণ ও উজানের ঢলে সৃষ্ট প্রলয়ংকরী বন্যায় ফেনী জেলার প্রতিটি উপজেলা লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় এবং ২৯ জনের প্রাণহানি ঘটে। সেই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে স্থায়ীভাবে উত্তরণের লক্ষ্যেই পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় এই নতুন প্রকল্পটি গ্রহণের প্রস্তাব করেছে।
প্রস্তাবিত এই প্রকল্পটি নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬-এ বর্ণিত পানি সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধার এবং দুর্যোগঝুঁকি প্রশমনের লক্ষ্যগুলোর সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এর প্রধান কার্যক্রমগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- ১১.৭৩ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ;
- ৬৭.৯২ কিলোমিটার বাঁধ পুনর্বাসন;
- ৮৩.৫০ কিলোমিটার নদী ও জলাধার পুনঃখনন;
- ২৭টি বিদ্যমান সেচ অবকাঠামোর পুনর্বাসন; এবং
- একটি হাইড্রোলিক এলিভেটেড ড্যাম নির্মাণ।
ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল আলম মজনু বলেন, "ফেনীর বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ কৃষি, শিল্প ও অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় পাহাড়ি ঢলের কারণে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন। আজ এই প্রকল্প একনেকে পাস হওয়ার খবরে জেলাবাসীর মধ্যে আনন্দের বন্যা বইছে। মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এই অঞ্চলের মানুষের মুক্তির মহাসোপান। এটি বাস্তবায়িত হলে জনজীবনে আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরে আসবে।"
