সামরিক শাসনে পেলের নীরবতা: উত্তর মিলবে নেটফ্লিক্স তথ্যচিত্রে

ব্রাজিলের ফুটবল কিংবদন্তি পেলের জীবন নিয়ে অসংখ্য তথ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে। তবে ২০২১ সালে নেটফ্লিক্সে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘পেলে’ শিরোনামের তথ্যচিত্রটি বেশ কিছু কারণে স্বতন্ত্র। এটি কেবল একজন ক্রীড়াবিদের সাফল্যের কাহিনি নয়, বরং একটি দেশের ইতিহাস, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এক জীবন্ত কিংবদন্তির গল্প তুলে ধরে।

ডেভিড ট্রাইহর্ন ও বেন নিকোলাস পরিচালিত এই তথ্যচিত্রে পেলের ফুটবল জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—১৯৫৮ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তাঁর উত্থান, অবিস্মরণীয় সাফল্য এবং জাতীয় প্রতীকে পরিণত হওয়ার আখ্যান বর্ণিত হয়েছে। এটি নিছকই গোল, ট্রফি বা রেকর্ডের বিবরণ নয়; বরং একজন মানুষের ভেতরের সংঘাত, দায়িত্ববোধ এবং বিশ্বজোড়া খ্যাতির গুরুভার বহনের ইতিহাস এর মূল উপজীব্য।

দারিদ্র্য থেকে বিশ্বসেরা

১৯৪০ সালে ব্রাজিলের মিনাস জেরাইস অঙ্গরাজ্যের ত্রেস কোরাসোইস নামের এক ছোট শহরে পেলের জন্ম। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো। পরিবারে চরম অর্থকষ্ট ছিল। বাবা দোন্দিনহো নিজেও একজন ফুটবলার হলেও বড় কোনো সাফল্য অর্জন করতে পারেননি। ছোটবেলায় পেলের খেলনা বলতে ছিল শুধু কাপড় দিয়ে বানানো একটি বল। তথ্যচিত্রে পেলে স্মৃতিচারণ করে বলেন, শৈশবে তাঁর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল পরিবারের আর্থিক দুর্দশা ঘোচানো। তাঁর কাছে ফুটবল তখন কেবল একটি খেলা ছিল না, ছিল বেঁচে থাকার এক অবলম্বন।

সেই ছোট্ট ছেলেটিই মাত্র ১৫ বছর বয়সে সান্তোস ক্লাবে যোগ দেন এবং ১৬ বছর বয়সে ব্রাজিল জাতীয় দলে ডাক পান। খুব দ্রুতই ফুটবল বিশ্ব বুঝতে পারে যে তারা এক অসাধারণ প্রতিভার উন্মোচন দেখতে যাচ্ছে।

১৯৫৮: বিশ্বজুড়ে পেলের পরিচিতি

তথ্যচিত্রের অন্যতম শক্তিশালী অধ্যায় হলো ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপ। সুইডেনে অনুষ্ঠিত সেই আসরে মাত্র ১৭ বছর বয়সী পেলে তাঁর অসাধারণ নৈপুণ্যে বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দেন। সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক এবং ফাইনালে স্বাগতিক সুইডেনের বিপক্ষে জোড়া গোল করে তিনি টুর্নামেন্টের সবচেয়ে আলোচিত তারকায় পরিণত হন। বিশ্বকাপ জয়ের পর কিশোর পেলের কান্নায় ভেঙে পড়ার দৃশ্য ফুটবল ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত হিসেবে আজও স্মরণীয়।

তথ্যচিত্রে সাবেক সতীর্থ, সাংবাদিক ও ইতিহাসবিদেরা ব্যাখ্যা করেন যে, সেই জয় কেবল একটি ট্রফি অর্জন ছিল না। সে সময় ব্রাজিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করার চেষ্টা করছিল, আর পেলে হয়ে উঠেছিলেন সেই নতুন ব্রাজিলের প্রতিচ্ছবি।

কৃষ্ণাঙ্গ পরিচয়ের নতুন প্রতীক

পেলের উত্থানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর বর্ণগত পরিচয়। সে সময় ব্রাজিলে বর্ণবৈষম্য নিয়ে প্রকাশ্যে খুব বেশি আলোচনা না হলেও সমাজের গভীরে এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।

একজন দরিদ্র কৃষ্ণাঙ্গ তরুণের বিশ্বসেরা ফুটবলার হয়ে ওঠা লাখো মানুষের কাছে ছিল এক বিশাল অনুপ্রেরণার উৎস। তথ্যচিত্রে দেখানো হয়েছে যে, পেলের জনপ্রিয়তা কেবল ফুটবল মাঠেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি সামাজিক অগ্রগতিরও প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন। তবে এই বিপুল জনপ্রিয়তার সঙ্গে এসেছিল প্রচণ্ড চাপ। তাঁকে সব সময় নিখুঁত থাকতে হতো এবং ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ প্রায় ছিল না বললেই চলে।

১৯৬২ ও ১৯৬৬: গৌরবের আড়ালে হতাশা

১৯৬২ সালে ব্রাজিল আবারও বিশ্বকাপ জয় করে, কিন্তু পেলে চোটের কারণে টুর্নামেন্টের বেশিরভাগ ম্যাচ খেলতে পারেননি। যদিও দল শিরোপা জেতে, ব্যক্তিগতভাবে তিনি সেই সাফল্যের পূর্ণ আনন্দ উপভোগ করতে পারেননি। এরপর ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ ছিল তাঁর জন্য এক দুঃস্বপ্ন। প্রতিপক্ষের কঠোর ট্যাকল এবং অপর্যাপ্ত সুরক্ষার কারণে পেলে বারবার আহত হন। হতাশ হয়ে তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন।

তথ্যচিত্রে এই অধ্যায়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে, কারণ এখানেই সুপারস্টার পেলের আড়ালে থাকা মানুষটিকে দেখা যায়—যিনি ছিলেন ক্লান্ত, আহত এবং প্রচণ্ড মানসিক চাপে জর্জরিত।

সামরিক শাসনের ছায়ায় পেলে

তথ্যচিত্রের সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলোর মধ্যে একটি হলো ব্রাজিলের সামরিক শাসন প্রসঙ্গ। ১৯৬৪ সালে ব্রাজিলে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে এবং এরপর দীর্ঘ সময় দেশটি সামরিক সরকারের অধীনে পরিচালিত হয়। এই সময়ে পেলে ছিলেন দেশের সবচেয়ে পরিচিত এবং জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। অনেকেই আশা করেছিলেন যে তিনি রাজনৈতিক অবস্থান নেবেন অথবা সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলবেন, কিন্তু পেলে মূলত নীরব থাকেন।

তথ্যচিত্রে এই বিষয়টি নিয়ে বিতর্কও তুলে ধরা হয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, সরকার পেলের জনপ্রিয়তা ব্যবহার করে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার চেষ্টা করেছে। আবার অন্যদের যুক্তি ছিল যে, পেলে একজন ক্রীড়াবিদ ছিলেন এবং তাঁর ওপর রাজনৈতিক নেতার দায়িত্ব চাপানো উচিত নয়।

পেলে নিজে বলেছেন যে, তিনি সব সময় ফুটবলকে মানুষের আনন্দের উৎস হিসেবে দেখতে চেয়েছেন এবং রাজনীতির সংঘাতে জড়াতে চাননি। তথ্যচিত্রের এই অংশটি কেবল ক্রীড়াকেন্দ্রিক গল্পের বাইরে গিয়ে দর্শকদের ভাবতে বাধ্য করে যে, একজন জাতীয় আইকনের দায়িত্ব আসলে কতটা বিস্তৃত হতে পারে।

১৯৭০: সর্বকালের সেরা বিশ্বকাপ

তথ্যচিত্রের আবেগঘন চূড়ান্ত অংশটি হলো ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপ। মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত সেই আসরে পেলে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবল দলকে নেতৃত্ব দেন। জাইরজিনহো, তোস্তাও, রিভেলিনো, কার্লোস আলবার্তোর মতো তারকাখচিত সেই ব্রাজিল দলকে আজও অনেকে সর্বকালের সেরা দল হিসেবে গণ্য করেন।

ফাইনালে ইতালিকে ৪-১ গোলে পরাজিত করে ব্রাজিল তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জেতে। এর মাধ্যমে পেলে তিনটি বিশ্বকাপ জেতা একমাত্র ফুটবলার হিসেবে ইতিহাস গড়েন। তথ্যচিত্রে সেই দলের খেলা, গোল এবং মাঠের বাইরের মুহূর্তগুলো এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা দর্শকদের যেন সেই সোনালি সময়ে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

বিশেষ করে কার্লোস আলবার্তোর সেই বিখ্যাত গোলের আগে পেলের নিখুঁত পাসের দৃশ্য আজও ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে শিহরণ জাগায়।

মানুষ পেলে

তথ্যচিত্রটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এটি পেলের কিংবদন্তি ইমেজের আড়ালে থাকা মানুষটিকেও তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের ভালোবাসা পেলেও তিনি সব সময় সুখী ছিলেন না। পরিবার, সম্পর্ক, সমালোচনা এবং প্রত্যাশার বিশাল চাপ নিয়ে তাঁকে সংগ্রাম করতে হয়েছে। তাঁর মুখে যখন শোনা যায়, ‘আমি শুধু একজন মানুষ ছিলাম,’ তখন বোঝা যায় যে কিংবদন্তিরাও আসলে রক্ত-মাংসের মানুষ।

ফুটবলের বাইরেও এক উত্তরাধিকার

পেলের প্রভাব কেবল ফুটবল মাঠেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ফুটবলকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে তিনি অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। আজকের দিনে লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বা কিলিয়ান এমবাপ্পেদের যে বৈশ্বিক তারকা মর্যাদা, তার ভিত্তি পেলের সময়েই তৈরি হয়েছিল।

পেলে ছিলেন প্রথম বৈশ্বিক ফুটবল সুপারস্টার, এমন একজন খেলোয়াড় যাঁর নাম পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশে পরিচিত ছিল।

তথ্যচিত্রটির নির্মাণশৈলী

‘পেলে’ তথ্যচিত্রের নির্মাণশৈলীও অত্যন্ত প্রশংসার দাবি রাখে। বিরল আর্কাইভ ফুটেজ, পুরোনো সাক্ষাৎকার, সমসাময়িক বিশ্লেষণ এবং পেলের নিজস্ব বক্তব্যের সমন্বয়ে এটি এক ধরনের সময়ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তৈরি করে। নির্মাতারা কেবল সাফল্যের গল্পই বলেননি, তাঁরা বিতর্ক, সমালোচনা এবং পেলের জটিল ব্যক্তিত্বকেও স্থান দিয়েছেন। ফলে এটি কোনো একপেশে স্তুতিগানে পরিণত হয়নি।

কেন আজও প্রাসঙ্গিক

২০২১ সালে মুক্তির সময় পেলের বয়স প্রায় ৮০ বছর ছুঁই ছুঁই ছিল। কিন্তু এই তথ্যচিত্র প্রমাণ করে যে তাঁর গল্প কখনো পুরোনো হয় না। আজকের প্রজন্ম হয়তো তাঁকে সরাসরি খেলতে দেখেনি, কিন্তু ফুটবলকে বিশ্বব্যাপী যে উচ্চতায় তিনি নিয়ে গেছেন, তার প্রভাব আজও গভীরভাবে অনুভূত হয়। পেলের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, খেলাধুলা কখনো কখনো একটি দেশের ইতিহাস বদলে দিতে পারে এবং একজন ফুটবলারও জাতীয় পরিচয়ের প্রতীকে পরিণত হতে পারেন।

‘পেলে’ আসলে কেবল একজন ফুটবলারের জীবনী নয়। এটি একটি দেশের আত্মপরিচয়ের গল্প, একটি নির্দিষ্ট সময়ের রাজনৈতিক ইতিহাস এবং বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের ভালোবাসা পাওয়া এক কিংবদন্তির মানবিক প্রতিচ্ছবি।

তথ্যচিত্রটি দেখার পর মনে হয়, পেলে শুধু গোল করেননি, তিনি মানুষের কল্পনাকেও নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। একজন দরিদ্র কৃষ্ণাঙ্গ কিশোর থেকে বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত ক্রীড়াবিদ হয়ে ওঠার তাঁর এই যাত্রা আজও অবিশ্বাস্য।