বর্ষার আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গেই ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকাতেই এডিস মশার লার্ভা বা শূককীটের উপস্থিতি উদ্বেগজনক মাত্রায় রয়েছে। শুধু রাজধানী নয়, দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে এডিসের লার্ভার ঘনত্ব ঢাকার চেয়েও বেশি পাওয়া গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ২৯ জুন পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৬ হাজার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে জুন মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৭২৭ জন, যা এ বছরের মোট আক্রান্তের প্রায় অর্ধেক। জুনে মৃত্যু হয়েছে ১৩ জনের, যার মধ্যে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায়ই প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচজন। জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক বে-নজির আহমদের মতে, ডেঙ্গু এখন আর কেবল ঢাকার সমস্যা নয়, বরং এটি দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
মশার প্রজননের হার পরিমাপের একক ব্রুটো ইনডেক্স (বিআই) অনুযায়ী, প্রতি ১০০ প্রজনন উৎসের মধ্যে ২০টির বেশি লার্ভা পাওয়া গেলে তা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে গণ্য হয়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১২ থেকে ১৬ জুন চালানো পর্যবেক্ষণে ফুলের টব, প্লাস্টিকের পাত্র, ড্রেন ও পানির ট্যাংকে লার্ভার উচ্চ ঘনত্ব পাওয়া গেছে। এসব এলাকায় গড় বিআই ৪০-এর ওপরে, এমনকি কোনো কোনো স্থানে তা ৭৩ দশমিক ৩৩ পর্যন্ত রেকর্ড করা হয়েছে। যদিও ঢাকা উত্তর সিটির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী জানিয়েছেন, লার্ভা বেশি থাকলেও বড় ধরনের মশা তৈরির মতো পরিবেশ এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতেই বিআই ২০-এর ওপরে এবং ২৭টি ওয়ার্ডকে অতিঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে।
রাজধানীর বাইরে চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে পরিচালিত জরিপে কক্সবাজারে বিআই ৪৫ থেকে ৯২ পর্যন্ত পাওয়া গেছে, যা উদ্বেগজনক। এছাড়া বরিশালে ৩৪, পিরোজপুরে ৪৩ এবং চট্টগ্রাম নগরে ৩১ বিআই পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগী, মশা, জীবাণু এবং পরিবেশের অনুকূল ত্রিভুজ তত্ত্বের কারণে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বিদ্যমান। এ বছর এপ্রিল মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা এডিসের প্রজননের জন্য সহায়ক আবহাওয়া তৈরি করেছে বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদ ও বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ বছর এখন পর্যন্ত ঢাকা বিভাগে ২ হাজার ৯৩ জন, বরিশাল বিভাগে ১ হাজার ৫৮৭ জন এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ১ হাজার ১১৬ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। বরিশাল জেলায় ৩৮৩ জন, পিরোজপুরে ৩৯১ জন ও ঝালকাঠিতে ৩০৪ জন রোগী পাওয়া গেছে। অধ্যাপক বে-নজির আহমদের মতে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুতি ঢাকাকেন্দ্রিক রয়ে গেছে, যা জেলা পর্যায়ে বাড়ানোর প্রয়োজন। এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
