জ্বালানি গবেষণায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলেন বাংলাদেশি আজম খান

বাংলাদেশের তরুণ গবেষক আজম খান জ্বালানি খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং প্রেডিকটিভ অ্যানালিটিকস নিয়ে তাঁর উল্লেখযোগ্য গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। জ্বালানি অবকাঠামোর নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধিতে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘বৈশ্বিক স্বীকৃতি পুরস্কার ২০২৬ (গবেষণা বিভাগ)’–এ ভূষিত হয়েছেন। এই পুরস্কারের জন্য প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৫ হাজার আবেদনকারীর মধ্য থেকে মাত্র ৫ দশমিক ৮ শতাংশকে নির্বাচিত করা হয়, যা এর প্রতিযোগিতামূলক প্রকৃতি প্রমাণ করে।

আজম খানের গবেষণার প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা তাঁর গুগল স্কলার প্রোফাইল থেকে স্পষ্ট। বর্তমানে তাঁর গবেষণাকর্ম ৩০৭টি সাইটেশন (উদ্ধৃতি) অর্জন করেছে, যেখানে তাঁর এইচ–ইনডেক্স ১২ এবং আই ১০–ইনডেক্স ১৫। এছাড়াও, তাঁর ১৫টির বেশি পিয়ার–রিভিউড গবেষণা প্রবন্ধ, আইইইই সদস্যপদ এবং এআই সমন্বিত ডেটা প্রসেসিং ও সাপ্লাই চেইন প্রযুক্তি–সংক্রান্ত একটি পেটেন্ট রয়েছে।

তাঁর গবেষণার একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও আধুনিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধি। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জার্নাল আইইইই ওপেন জার্নাল অব দ্য কম্পিউটার সোসাইটিতে প্রকাশিত তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য গবেষণা হলো—বায়ু টারবাইনের সেন্সরের ত্রুটি শনাক্তকরণে পদার্থবিজ্ঞান নির্দেশিত বায়েসিয়ান নিউরাল নেটওয়ার্ক। এই গবেষণায় তিনি পদার্থবিজ্ঞানভিত্তিক মডেল ও বায়েসিয়ান নিউরাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বায়ু টারবাইনের সেন্সরের ত্রুটি শনাক্ত করার একটি উন্নত এআই পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে এই মডেল ৯৭ দশমিক ৬ শতাংশ নির্ভুলতা ও ৯১ দশমিক ৮ শতাংশ রিকল অর্জন করেছে। এক্সপ্লেইনেবল এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে এটি গিয়ারবক্সের তাপমাত্রা, ব্লেডের কম্পন ও জেনারেটরের টর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ত্রুটির কারণও ব্যাখ্যা করতে পারে, যা বড় কোনো ক্ষতি হওয়ার আগেই প্রকৌশলীদের সতর্কতা সংকেত পাঠাতে সক্ষম।

আজম খানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হলো, দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় জ্বালানি ব্যবহারের ধরন অপ্টিমাইজ বা সর্বোত্তমকরণ: টেকসই সম্পদ ব্যবস্থাপনায় একটি এআই–চালিত পদক্ষেপ। এই গবেষণায় তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শক্তি ব্যবস্থাপনার কৌশল দেখিয়েছেন, যা বাংলাদেশের গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম বা সাভারের মতো ভারী শিল্পাঞ্চলগুলোর জন্য অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। এর মাধ্যমে শক্তির অপচয় কমিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের শিল্পকারখানার প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব।

একসময় বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের অগ্রগতি পরিমাপ করা হতো বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা, সঞ্চালন লাইন ও মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে। ২০০৯ সালে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ৫ হাজার মেগাওয়াটের কম থাকলেও, ২০২৫ সালের মধ্যে তা ৩০ হাজার মেগাওয়াট অতিক্রম করেছে এবং বিদ্যুতের সুবিধা পাওয়া জনগোষ্ঠীর হার ৯৯ শতাংশের ওপরে পৌঁছেছে। তবে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ ভিন্ন; এখন প্রয়োজন এমন বুদ্ধিমান প্রযুক্তি যা বিদ্যুতের চাহিদার পূর্বাভাস দেবে, অপচয় কমাবে এবং বড় দুর্ঘটনার আগেই অবকাঠামোর ত্রুটি শনাক্ত করতে পারবে। সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ ও ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য পূরণে সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ডেটাভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্য করে তুলতে আজম খানের গবেষণা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

আজম খান কেবল গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ নন, বৈশ্বিক শিল্প খাতেও তাঁর কাজের সফল প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামায় হুন্দাই মোটর ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের উৎপাদন কার্যক্রমে অপারেশনস ডেটা অ্যানালিস্ট হিসেবে কর্মরত। সেখানে তিনি মেশিন লার্নিং, ডেটা অ্যানালিটিকস ও শক্তি দক্ষতা উন্নয়নসংক্রান্ত প্রকল্পে কাজ করছেন। আজম খানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে সমন্বিত ডেটা সিস্টেম ও প্রেডিকটিভ মেইনটেন্যান্স, কার্বন–সচেতন এআই উন্নয়ন এবং ডেটা সেন্টারের মতো শক্তিশালী ও নিবিড় ডিজিটাল অবকাঠামোর জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি।

হোয়াটসঅ্যাপে প্রথম আলোকে আজম খান বলেন, ‘ভবিষ্যতের জ্বালানি ব্যবস্থায় শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ালেই হবে না। কোন সময় কত বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে, কোথায় ত্রুটি দেখা দিতে পারে কিংবা কোথায় অপচয় হচ্ছে—এসব সিদ্ধান্তও এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে আরও নির্ভুলভাবে নেওয়া সম্ভব। তবে একই সঙ্গে এআই প্রযুক্তিকেও আরও শক্তিশালী ও দক্ষ করে তুলতে হবে।’

আজম খানের জন্ম ও বেড়ে ওঠা বাংলাদেশে। বরিশাল ও ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার পর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। তিনি ইন্টারন্যাশনাল আমেরিকান ইউনিভার্সিটি (লস অ্যাঞ্জেলেস) থেকে ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমসে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। এর আগে তিনি দেশের তৈরি পোশাক খাত ও হসপিটালিটি খাতেও ডেটা অ্যানালিটিকস নিয়ে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি আইইইই ও অরকিড–এর সক্রিয় সদস্য। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও টেকসই প্রযুক্তিগত নেতৃত্বে এই বাংলাদেশি তরুণের অবদান দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে। তাঁর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য—এআইয়ের মাধ্যমে ‘ক্রিটিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ বা গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোগুলোকে আরও শক্তিশালী ও পরিবেশবান্ধব করে তোলা।