মেসি-রোনালদোর স্তরে কেন এখনো পৌঁছাতে পারেননি এমবাপ্পে ও হালান্ড

ফুটবল জগতে লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর গত প্রায় দুই দশকের আধিপত্যের পর কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং আরলিং হালান্ডকে ফুটবলের নতুন মহারণ হিসেবে ধরা হয়েছিল। ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী তারকা এমবাপ্পে এবং নরওয়ের তারকা স্ট্রাইকার হালান্ড এখন ২০২৬ বিশ্বকাপে মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিলেও, তাদের ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন পর্যন্ত প্রত্যাশিত মাত্রায় গড়ে ওঠেনি। বিশ্বকাপে মাত্র দুটি করে ম্যাচ খেলেই তারা এখন একই গ্রুপে মুখোমুখি হওয়ার অপেক্ষায় আছে এবং গোল্ডেন বুটের দৌড়ে দুর্দান্ত লড়াইও চালিয়ে যাচ্ছে। দুইজনই নিজেদের প্রথম দুই ম্যাচে জোড়া গোল করেছেন—এমবাপ্পে ও হালান্ড আলাদা ম্যাচে এই সাফল্য পান। ফলে বোস্টনে গ্রুপ নির্ধারণী যে ম্যাচে তাদের মুখোমুখি লড়াইটি গ্রুপের শীর্ষস্থান নির্ধারণ করবে। শুক্রবার (২৬ জুন) দিবাগত রাত ১টায় বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ম্যাচে মাঠে নামছে ফ্রান্স-নরওয়ে। বর্তমানে দুজনই ৪ গোল করে সমান অবস্থানে আছেন। তবে সর্বোচ্চ গোলদাতার দৌড়ে এখনও এগিয়ে আছেন আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি, যিনি প্রথম দুই ম্যাচে পাঁচ গোল করে দলের জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন।

এমবাপ্পে ও হালান্ডের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখনও মেসি-রোনালদো স্তরে না পৌঁছানোর কারণসমূহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হালান্ড খেলছেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে, আর এমবাপ্পে আছেন লা লিগার সফল দল রিয়াল মাদ্রিদে। তারা আলাদা লিগে থাকায় সরাসরি মুখোমুখি হওয়া বেশ কম হয়। অন্যদিকে মেসি ও রোনালদো ছিলেন একই সময়ে স্পেনের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাব বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদে। ফলে মৌসুমে একাধিকবার তারা মুখোমুখি হতেন এবং এই বিষয়টি তাদের দ্বৈরথকে আরও তীব্র করেছিল। নরওয়ে দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক মঞ্চে বড় টুর্নামেন্টে ছিল না, তাই হালান্ডের বড় আসরে অভিজ্ঞতা সীমিত ছিল। এবারই তিনি প্রথম বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলছেন। অন্যদিকে এমবাপ্পে ইতোমধ্যে পাঁচটি বড় টুর্নামেন্ট খেলেছেন এবং ২০১৮ বিশ্বকাপ জয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু মেসির আর্জেন্টিনা ও রোনালদোর পর্তুগাল তাদের জাতীয় দলের খেলা শুরুর সময় থেকেই প্রায় প্রতিটি মেজর টুর্নামেন্টেই অংশ নেওয়ার যোগ্য ছিল।

দুজনই একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং প্রকাশ্যে তীব্র বিরোধ নেই, বরং তারা প্রশংসাও করেছেন। হালান্ড এক সাক্ষাৎকারে এমবাপ্পেকে ‘অবিশ্বাস্য খেলোয়াড়’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। এছাড়া হালান্ড মূলত একজন স্ট্রাইকার, যিনি বক্সে অবস্থান করে গোল করেন। অন্যদিকে এমবাপ্পে উইং ও আক্রমণের বিভিন্ন পজিশনে খেলে থাকেন। অপরপক্ষে মেসি-রোনালদো দুইজনই মূলত উইংগার ও ফরোয়ার্ডের ভূমিকায় খেলতেন এবং প্লে-মেকিংয়ে বড় ভূমিকা রাখতেন; মেসি-রোনালদো কখনোই স্ট্রাইকারের ভূমিকায় খেলেননি। তারা বারবার বলেছেন, তারা নিজেদেরকে মেসি ও রোনালদোর সঙ্গে তুলনা করতে চান না। হালান্ড বলেছেন, মেসি ও রোনালদো যা করেছেন তা অবিশ্বাস্য এবং এখনো তারা দারুণ খেলছেন। এমবাপ্পেও বলেছেন, তার লক্ষ্য দলকে জেতানো, ব্যক্তিগত তুলনা নয়।

চ্যাম্পিয়ন্স লিগে তাদের একাধিকবার মুখোমুখি লড়াই হয়েছে। ২০১৯–২০ মৌসুমে হালান্ড তখন বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের হয়ে এমবাপ্পের পিএসজির বিপক্ষে খেলেন। হালান্ড গোল করলেও শেষ পর্যন্ত পিএসজি জয় পায়। ২০২৪–২৫ মৌসুমে আবারও তাদের দেখা হয়—এবার এমবাপ্পে রিয়াল মাদ্রিদে এবং হালান্ড ম্যানচেস্টার সিটিতে। এমবাপ্পে একটি ম্যাচে হ্যাটট্রিক করে আলোচনায় আসেন, আবার হালান্ডও গুরুত্বপূর্ণ গোল করেন। যদি কখনো হালান্ড বার্সেলোনায় যোগ দেন এবং এমবাপ্পে রিয়াল মাদ্রিদেই থাকেন, তাহলে এল ক্লাসিকোতে সরাসরি তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই দ্বৈরথকে মেসি-রোনালদো স্তরের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে। তবে আপাতত তাদের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে, আর বিশ্বকাপের এই মুখোমুখি লড়াই সেটিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে। তবে মেসি-রোনালদোর দ্বৈরথের সমান হতে এমবাপ্পে-হালান্ডকে এখনো লম্বা পথ পাড়ি দিতে হবে তা বলাই যায়।