সংসদে অনুপস্থিতিতে এমপিদের ক্ষোভ
জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি নিয়ে এক নতুন ধারার সংস্কৃতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সংসদ সদস্যদের মধ্যে এমন একটি প্রবণতা দেখা দিচ্ছে যেখানে প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে তারা আর সংসদে উপস্থিত থাকতে আগ্রহী হন না। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি থাকলেই কেবল সংসদ সদস্যদের বাকপ্রবাহ প্রবল বেগে প্রবাহিত হয়। অন্যথায়, বক্তৃতা দেওয়ার আগ্রহ বা মনোযোগ অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়ে।
সেলিম ভূঁইয়ার অভিমান
গত ১৬ জুন সংসদে এমন এক ঘটনার সাক্ষী হতে হয়েছে। সেদিন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল কুমিল্লা-২ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য মো. সেলিম ভূঁইয়াকে বাজেটের ওপর আলোচনার জন্য আহ্বান জানান। কিন্তু তিনি প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ‘আমারে দেন ছয় মিনিট, আর অন্যদের দেন দশ মিনিট, বারো মিনিট। এর প্রতিবাদে আমি বক্তৃতা দিলাম না।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, তার সিরিয়াল যদি আট নম্বরে থাকতো, তবে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সামনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পেতেন। তিনি স্পষ্ট জানান, প্রধানমন্ত্রীর সামনে বক্তব্য না দেওয়াটা তার কাছে ‘বঞ্চিত’ হওয়ার শামিল। পরে বক্তব্য দিলেও তিনি ‘মন খারাপ’ থাকার কথা স্বীকার করেন।
প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের হিড়িক
পরদিন অর্থাৎ ১৭ জুন প্রধানমন্ত্রী মৌলভীবাজার সফরে গেলে সিলেটের সাতজন সংসদ সদস্য তাকে অভ্যর্থনা জানাতে ওসমানী বিমানবন্দরে ভিড় করেন। অথচ ওই সময়ে সংসদ অধিবেশন চলছিল। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘সংসদ নাই আজকে? এখানে কেন? সংসদে যান।’ এই মন্তব্যের পর সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরী এবং এমপি কয়ছর আহমেদ দ্রুত সংসদ অধিবেশনে যোগ দেন।
মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি ও স্পিকারের মন্তব্য
শুধু এমপিরাই নন, মন্ত্রী পরিষদের সদস্যদের ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে সংসদে অনাগ্রহ দেখা যায়। ২২ জুন বাজেট আলোচনার সময় একাধিক মন্ত্রীর আসন খালি ছিল। এ নিয়ে বিরোধী দলের এক সদস্য পয়েন্ট অব অর্ডারে প্রশ্ন তুললে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বাজেট অধিবেশনে মন্ত্রীদের আরও উপস্থিতি দেখতে চাই। শোকর করেন যে অর্থমন্ত্রী অন্তত আছেন এখানে।’ স্পিকারের এই উক্তি বর্তমান সংসদীয় সংস্কৃতির সংকুচিত সম্ভ্রমকে ফুটিয়ে তোলে।
সংসদীয় সংস্কৃতির দায়বদ্ধতা
গত ২৭ এপ্রিল সরকারি দলের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি সংসদে স্বীকার করেন যে, প্রধানমন্ত্রী এই সংসদের প্রাণ এবং তার অনুপস্থিতিতে অনেক বক্তাই বক্তব্য দিতে চান না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোকে যেখানে রাজনীতি ব্যক্তিসর্বস্ব হয়ে ওঠে, সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক প্রজ্ঞা ও শৃঙ্খলা ঝুঁকির মুখে পড়ে। সংসদ এখন আর কেবল আলোচনার মুক্তাঙ্গন নয়, বরং অনেকের কাছেই এটি কেবল প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের একটি মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
