টানা ১১ দিনের অত্যন্ত অস্থির ও উত্তেজনাপূর্ণ লড়াই, রোলার কোস্টারের মতো উত্থান-পতন আর দম ফেলার সুযোগ না দেওয়া ক্রিকেটীয় লড়াইয়ের পর এই সিরিজটিতে একটি প্রশান্তিময় পরিবেশের বড়ই প্রয়োজন ছিল। স্নায়ুর চাপ কমিয়ে, মানসিক অস্থিরতা দূর করে এবং টেস্ট ক্রিকেটের আসল সৌন্দর্য ও গাম্ভীর্য ফিরিয়ে আনার জন্য একটি ধীরস্থির লড়াইয়ের প্রত্যাশা ছিল সবার। অবশেষে বুধবার নিউল্যান্ডসে সেই প্রশান্তির দেখা মিলল। দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার তৃতীয় ও নির্ণায়ক টেস্টের দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষে সফরকারী অস্ট্রেলিয়া ৬ উইকেট হাতে রেখে মাত্র ১ রানে এগিয়ে আছে।
বোলারদের কঠিন পরীক্ষা ও স্টার্কের তাণ্ডব
মেঘমুক্ত আকাশ আর খরা উইকেটে খেলার গতি ছিল অত্যন্ত মন্থর, যা বোলারদের চরম ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়েছে। মঙ্গলবার যেখানে ফ্লাডলাইটের আলোয় এবং ঘন মেঘের ছায়ায় নতুন বলে মিচেল স্টার্কের তাণ্ডব দেখা গিয়েছিল—যিনি মাত্র ৯ বলে ২ রান দিয়ে ৪টি উইকেট তুলে নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম ইনিংস ৩২৯ রানে গুটিয়ে দিয়েছিলেন—বুধবারের পরিবেশ ছিল একেবারেই বিপরীত।
বুধবার তেমন কোনো নাটকীয়তা দেখা যায়নি। দিনের শেষভাগে দ্বিতীয় নতুন বলে খেলা ১০ ওভারে জশ ইংলিশ এবং অ্যালেক্স ক্যারি অনবদ্য ১৪৫ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে আরও ৪৪ রান যোগ করে অস্ট্রেলিয়াকে এগিয়ে দেন। বৃহস্পতিবারের জন্যও একই ধরনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস থাকায় রানের গতি থামানো বেশ কঠিন হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার পেস আক্রমণের চোট সমস্যা
স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায় যখন তাদের মূল দুই নতুন বলের বোলার কাগিসো রাবাদা এবং মার্কো জানসেন বিকালের খেলার সিংহভাগ সময় মাঠের বাইরে থাকেন। দলের ম্যানেজমেন্ট জানায়, রাবাদা পেটের সমস্যায় ভুগছিলেন এবং জানসেনের পিঠ শক্ত হয়ে গিয়েছিল।
দক্ষিণ আফ্রিকার বোলিং কোচ পিট বোথা সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “উইকেট যেভাবে আচরণ করছিল, তাতে আমরা জানতাম এটি একটি কঠিন দিন হতে যাচ্ছে। সেখানে বলের কোনো লেটারাল মুভমেন্ট ছিল না, তাই বড় ধরনের প্রচেষ্টা প্রয়োজন ছিল। আমি বোলারদের প্রচেষ্টায় কোনো খামতি দেখছি না, তারা সারা দিন আপ্রাণ চেষ্টা করেছে।”
ব্যাটিং ব্যর্থতা নিয়ে আক্ষেপ ও কোচের প্রতিক্রিয়া
তিনি আরও যোগ করেন, “যদি নিজেদের সমালোচনা করতে হয়, তবে বলব আমরা দীর্ঘ সময় ধরে সঠিক লেন্থে বল করতে পারিনি। এই ধরনের উইকেটে একটানা মেইডেন ওভার দিয়ে ব্যাটারদের ওপর চাপ তৈরি করতে হয় এবং ভুলের সুযোগ নিতে হয়। এমন পিচে সাফল্য পেতে কিছুটা ভাগ্যেরও প্রয়োজন হয়।”
মঙ্গলবার প্রথম উইকেটে ১৫৮ রান তোলার পর ২০৩/১ অবস্থা থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা মাত্র ১২৬ রানে ৯ উইকেট হারিয়ে ফেলেছিল। ব্যাটারদের ওপর বোলাররা ক্ষুব্ধ কি না জানতে চাওয়া হলে বোথা বলেন, “আমরা এটা নিয়ে কথা বলেছি, আমাদের উদ্বোধনী জুটির ওপর ভর করে আরও বড় সংগ্রহ গড়া উচিত ছিল। কিছু শট খেলাই ঠিক হয়নি। আজকের পিচের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে আমাদের আরও অনেক রান করা উচিত ছিল। আর মেঘ জমে উঠতেই নতুন বলে তারা আমাদের উড়িয়ে দিয়েছিল। আজও ভেবেছিলাম মেঘ আসবে, কিন্তু তা হয়নি।”
একনজরে ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য
- কিংসেমেডে প্রথম টেস্টে অস্ট্রেলিয়া ২১৪ রানে জয় লাভ করেছিল।
- সেন্ট জর্জ পার্কে দ্বিতীয় টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকা ইনিংস ও ৩১ রানে জিতে সিরিজে সমতা আনে।
- বুধবার মধ্যাহ্নভোজের বিরতির আগে সাইমন হারমার দ্রুত ট্র্যাভিস হেড ও মার্নাস লাবুশেনকে প্যাভিলিয়নে ফেরত পাঠান।
- এরপর দীর্ঘ ৩১.৫ ওভার দক্ষিণ আফ্রিকা কোনো উইকেটের দেখা পায়নি, পরে জানসেন পরপর ম্যাট রেনশ ও ক্যামেরন গ্রিনকে আউট করেন।
টেস্টের আসল আমেজ ও সিরিজের ভবিষ্যৎ
অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটার ম্যাট রেনশ জানান, দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে তাদের বিশ্বসেরা পেস ও স্পিন আক্রমণের বিরুদ্ধে খেলা সবসময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বের শীর্ষ দুটি টেস্ট দল যখন মুখোমুখি হয়, তখন ক্রিকেট অনেক সময় উগ্র হয়ে ওঠে, যা পরে পিচের পরিস্থিতি ও নিখাদ মনোযোগের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আসে। দক্ষিণ আফ্রিকা ২০২২ সালের ডিসেম্বর ও ২০২৩ সালের জানুয়ারির পর এবারই প্রথম তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলছে। বৃহস্পতিবার এই রোমাঞ্চকর সিরিজের ১৩তম দিনে খেলা গড়াচ্ছে, যা অনেকের জন্য সৌভাগ্যের এবং অন্যদের জন্য কঠিন পরীক্ষার কারণ হতে পারে।

