ঢাকার তুরাগ নদে গত দুই দিনে মো. সুমনসহ মোট তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে মো. সুমন (১৭) গত ২২ জুন থেকে নিখোঁজ ছিলেন এবং শুক্রবার তাঁর অর্ধগলিত মরদেহ আশুলিয়া থানা-পুলিশ তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করে। অন্য দুজন হলেন তুরাগ থানার রানাভোলা এলাকার আরিফ হাসান রাকিব এবং রাজধানীর মনিপুর মোল্লাপাড়ার রনি মোল্লা।
শনিবার দুপুরে রানাভোলা এলাকায় সুমনের ভাড়া বাসায় গিয়ে দেখা যায়, তাঁর বাবা মো. শাহ আলম, মা ও বোন বাকরুদ্ধ অবস্থায় বসে আছেন। সান্ত্বনা দেওয়ার পর তাঁরা জানান, শুক্রবার খবর পেয়ে তাঁরা সুমনের মরদেহ নিয়ে আসেন। সন্তান হারানোর মানসিক যন্ত্রণা এড়াতে তাঁরা সুমনের মোবাইল থেকে সব ছবি মুছে ফেলেছেন, বাসার ছবি ছিঁড়ে ফেলেছেন এবং মোবাইল ফোনটিও ভেঙে ফেলেছেন। পরিবারের সদস্য ও কয়েকজন প্রতিবেশী ফেসবুকে ‘Sumon Ahmed Chowdhury’ নামের একটি আইডি সুমনের বলে নিশ্চিত করেন। তাঁরা আরও জানান, সুমন কামারপাড়া আড়তে কাঁচামালের ব্যবসা করতেন। তাঁর ফেসবুক আইডি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৬ দিন আগে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে একটি শোভাযাত্রার ভিডিও আপলোড করা হয়েছিল। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে দলীয় কার্যক্রমের ভিডিও আপলোড করা হয়েছে।
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে জানান, গত ২৫ জুন দিবাগত রাতে আশুলিয়া বাজারের পাশে তুরাগ নদের এক চক থেকে স্থানীয়দের সংবাদের ভিত্তিতে একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে নিহত ব্যক্তির পরিবার মরদেহটি সুমনের বলে শনাক্ত করে। এ ঘটনায় সুমনের বড় ভাই অপমৃত্যুর মামলা করেছেন। ওসি আরও জানান, পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, ২২ জুন পিকনিকের কথা বলে সুমন বাসা থেকে বের হয়েছিলেন এবং পরে তুরাগ নদে পড়ে যান। তিনি সাঁতার জানতেন না। পরিবারের সদস্যরা নদে খোঁজাখুঁজি করেছিলেন। পুলিশ কেবল একটি লাশের বিষয়েই অবগত।
এদিকে, সুমনের মরদেহ উদ্ধারের পর থেকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ফেসবুক পেজ ও আইডি থেকে প্রচার করা হয় যে, তুরাগ থানা এলাকায় আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মিছিলে বিএনপি নেতা-কর্মী ও পুলিশের হামলার পর ৭ জন নেতা-কর্মী নিখোঁজ এবং ৩-৪ জনের মরদেহ তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ পুলিশ এই তথ্যকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও গুজব বলে জানিয়েছে। শনিবার সন্ধ্যায় পুলিশ সদর দপ্তর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ‘তুরাগ নদে ভাসছে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের সাত নেতা-কর্মীর লাশ’ শিরোনামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিত্তিহীন তথ্য প্রচার করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের কোনো ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি এবং এ ধরনের মিথ্যা অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য সবার প্রতি বাংলাদেশ পুলিশ অনুরোধ জানাচ্ছে। গাজীপুর মহানগর পুলিশও কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার স্বাক্ষরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে একই ধরনের কথা জানিয়েছে এবং মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশ তৎপর রয়েছে বলে উল্লেখ করেছে।
প্রথম আলো ঢাকার মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তুরাগ, রূপনগর, দারুস সালাম এবং ঢাকা জেলা পুলিশের আশুলিয়া থানা এলাকার তুরাগ নদের আওতাধীন ফায়ার সার্ভিস ও দুটি নৌ পুলিশ ফাঁড়ির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারে যে, ২৪ ও ২৫ জুন মো. সুমনসহ মোট তিনজনের লাশ তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
উদ্ধার হওয়া অন্য দুজনের মধ্যে তুরাগ থানার রানাভোলা এলাকার আরিফ হাসান রাকিবের মরদেহ গত বুধবার তুরাগ নদ থেকে নৌ পুলিশ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় নিহত আরিফের চাচা মো. আরশাদুল ইসলাম বাদী হয়ে একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছেন। আরিফের চাচা প্রথম আলোকে জানান, আরিফ ২২ জুন বেলা ১১টার দিকে বাসা থেকে বের হন এবং ওই দিন বিকেল ৪টার একটু আগে মোবাইলে মায়ের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। গত বুধবার তাঁর লাশ উদ্ধার হয়। আরিফ যে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন, তা তাঁরা জানতেন না; মৃত্যুর পর কয়েকজন ভিডিও-ছবি দেখানোর পর তাঁরা এ বিষয়ে জানতে পারেন। তাঁরা কীভাবে মারা গেছেন, তা জানেন না। একটি নিয়মের মধ্য দিয়ে যেতে হয় বলে তাঁরা মামলা করেছেন। বৃহস্পতিবার গ্রামের বাড়ি রংপুরে তাঁর মরদেহ দাফন করা হয়েছে। আরিফ সাঁতার খুব একটা ভালো জানতেন না।
আমিনবাজার নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) হুমায়ুন কবির জানান, ২৪ জুন সকালে আরিফ নামের একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই দিন দুপুরে দিয়াবাড়ি ঘাটে কয়েকজন একসঙ্গে গোসলের সময় রনি মোল্লা নামের একজন ডুবে যান। অন্যরা ঘণ্টাখানেক চেষ্টার পর তাঁকে মৃত অবস্থায় পাড়ে তোলেন। রনির মৃত্যু হওয়ার ঘটনায় সাভার মডেল থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে।
রাজধানীর মনিপুর মোল্লাপাড়ার বাসিন্দা রনি মোল্লার (৩৫) বাবা কফিল উদ্দিন মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, রনি উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকায় একটি হোটেলে কাজ করতেন। ২৪ জুন রনির মৃত্যুর খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে জানতে পারেন গোসল করার সময় তিনি মারা গেছেন। হোটেলের লোকজন জানিয়েছেন, ওই দিন সকালে রনি হোটেল থেকে বের হয়েছিলেন। তিনি আরও জানান, রনির মানসিক কিছু সমস্যা ছিল এবং যখন মন চাইত এদিক-সেদিক চলে যেতেন। তিনি কখনোই কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।
তবে উত্তরা ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাঁদের আওতাধীন এলাকায় ২২ জুন থেকে তুরাগ থানা, বাউনিয়া, বিরুলিয়া পর্যন্ত তুরাগ নদ থেকে কোনো মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা নেই। রূপনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নোমান হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ২২ মে থেকে আজ শনিবার পর্যন্ত তুরাগ নদ থেকে কোনো মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা নেই। দারুস সালাম থানার ওসি মো. দুলাল হোসেন প্রথম আলোকে জানান, নৌ পুলিশ তুরাগ নদ থেকে গত বুধবার আরিফ হাসান রাকিব নামের একজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে। তুরাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, তুরাগ নদের আশুলিয়া থানা এলাকা থেকে ২২ জুনের পর একটি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। ওই দিন মিছিল হয়েছিল, বেশ কিছু আসামি গ্রেপ্তার হয়েছিল, সবই হয়েছে আশুলিয়া থানা এলাকায়।
