মালয়েশিয়া সফরে এসে কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উষ্ণ লালগালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার পেয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল রোববার স্থানীয় সময় রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের বিশেষ ফ্লাইটটি কুয়ালালামপুরের বুঙ্গা রায়া কমপ্লেক্সের এক্সক্লুসিভ ভিভিআইপি টার্মিনালে অবতরণ করে। বিমানবন্দরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান মালয়েশিয়ার ধর্মমন্ত্রী ড. জুলকিফলি হাসান ও তার সহধর্মিণী। এ সময় ছোট শিশু মাইসা নুর আইশা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায়। প্রধানমন্ত্রী ও তার সহধর্মিণীকে লালগালিচা সংবর্ধনা জানানোর পাশাপাশি সুসজ্জিত বাহিনীর পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। গার্ড অব অনারের সময় দুই দেশের জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হয়। এই অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ হাইকমিশনার মনজুরুল করিম খান চৌধুরী এবং ডেপুটি হাইকমিশনার মিস সাহানারা মনিকা উপস্থিত ছিলেন।
বিমানবন্দরে সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার পর্ব শেষে প্রধানমন্ত্রীকে একটি বিশেষ মোটর শোভাযাত্রার মাধ্যমে কুয়ালালামপুরের ‘শাংগ্রি লা’ হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। এই হোটেলেই প্রধানমন্ত্রী, তার সহধর্মিণী এবং অন্যান্য সফরসঙ্গীরা অবস্থান করবেন। প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে হোটেল শাংগ্রি লা-তে অসংখ্য প্রবাসী বাংলাদেশী জড়ো হন। এরপর স্থানীয় সময় রাত সাড়ে দশটার দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হোটেলে আয়োজিত এক সুধী সমাবেশে অংশ নিয়ে বক্তব্য রাখেন। এই সমাবেশে মালয়েশিয়া বিএনপির সভাপতি প্রকৌশলী বাদলুর রহমান খান ও সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেনসহ পাঁচশতাধিক স্থানীয় নেতাকর্মী, প্রবাসী শিক্ষক-শিক্ষার্থী, প্রকৌশলী, শ্রমিক এবং মালয়েশিয়া হাইকমিশনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানানোর জন্য কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শাংগ্রি লা হোটেল পর্যন্ত সড়কপথ ৫০ মিনিটের মধ্যে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার জাতীয় পতাকায় সজ্জিত করা হয়। উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম মালয়েশিয়া সফর।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের মধ্যে রয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী খলিলুর রহমান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক উপদেষ্টা মাহাদী আমিন এবং প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা একেএম শামসুল ইসলামও এই সফরে রয়েছেন। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার, পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ আরও অনেকে সফরসঙ্গী হিসেবে উপস্থিত আছেন।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান সরকার গঠনের পরপরই মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম তাকে মালয়েশিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেই আমন্ত্রণের পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এই আনুষ্ঠানিক সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় চীন ও ভারতের পর মালয়েশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য সহযোগী দেশ হলো বাংলাদেশ। যদিও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে মালয়েশিয়া এখনও অনেক এগিয়ে আছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন, যা দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরে।
গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ও সমঝোতা স্মারক
আজ সোমবার সকালে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম পুত্রাজায়ায় তার কার্যালয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিকভাবে সংবর্ধনা জানাবেন। এই সংবর্ধনার পর দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে প্রথম একান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এরপর উভয় দেশের সরকার প্রধানের নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠক শেষে দুই প্রধানমন্ত্রী একটি যৌথ সংবাদ সম্মেলনে যোগ দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এই সফরে মালয়েশিয়ার সঙ্গে পর্যটন ও সংস্কৃতি বিষয়ক সহযোগিতা নিয়ে দুটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরকে ঘিরে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে আয়োজিত এই দুই দিনের (২১ ও ২২ জুন) সফরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব জোরদার করার বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রত্যাশা
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশীদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো বন্ধ ও সীমিত হয়ে থাকা শ্রমবাজারের জটিলতা দূর করা। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশের বিশাল চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বিগত দিনগুলোতে বিভিন্ন আইনি ও কূটনৈতিক জটিলতার কারণে এই খাতে স্থবিরতা নেমে এসেছে।
বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো. মামুন বিন আব্দুল মানুল বলেন, “বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকার গঠনের পর প্রথম মালয়েশিয়া সফর করছেন, যা কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে যে, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা শ্রমবাজার সিন্ডিকেট মুক্তভাবে চালু হবে এবং প্রবাসীদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে তিনি কিছু পদক্ষেপ নেবেন। বিশেষ করে দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য আরও সম্প্রসারিত হবে।”
কয়েকজন প্রবাসী আকুতি জানিয়ে বলেছেন, সিন্ডিকেট ভেঙে বিমান টিকিটের মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে হবে। তারা প্রধানমন্ত্রীর কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন, যাতে প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ কোনো মধ্যস্বত্বভোগী লুটে নিতে না পারে। প্রবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে এমন একটি বিষয় হলো, কেউ মারা গেলে তার লাশ দেশে পাঠানো। মালয়েশিয়ায় কর্মরত অবস্থায় কোনো প্রবাসী মারা গেলে তার লাশ দেশে পাঠানো নিয়ে পরিবারগুলোকে চরম ভোগান্তি ও আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। প্রবাসী বাংলাদেশিদের দীর্ঘদিনের দাবি হলো, কোনো প্রবাসী মারা গেলে যেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে সর্বোচ্চ তিন দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ সরকারি খরচে তার লাশ বাংলাদেশে স্বজনদের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। তারা আশা করছেন, প্রধানমন্ত্রী যেন এবারের সফরেই এই মানবিক দাবি পূরণের সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দেন।
মালয়েশিয়া প্রবাসী ও সেখানকার যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির কর্মবিষয়ক সম্পাদক জাহাঙ্গীর হাওলাদার বলেন, “মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন। রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের এই বিশাল ত্যাগ ও অবদানের বিপরীতে প্রধানমন্ত্রীর এই সফর তাদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এক নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে। কুয়ালালামপুরের বুকজুড়ে এখন একটাই সুর—প্রধানমন্ত্রীর হাত ধরে কাটবে প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দুঃখ-দুর্দশা, আর উন্মোচিত হবে সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, যাতে প্রবাসীদের লাশ তিন দিনের মধ্যে দেশে বিনা খরচে পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সেইসঙ্গে বিমানের টিকিট ও জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে সব ধরনের সিন্ডিকেট যেন ভেঙে দেওয়া হয়।”
