শিক্ষক থেকে গবেষক: তিতুমীর কলেজ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি আল

যে ক্লাসরুমে একসময় গণিতের জটিল সমীকরণ সমাধান করতেন, সেই ক্লাসেই শিক্ষক হিসেবে ফিরে আসার কথা কখনো কল্পনা করেননি মো. আল আমীন মিয়া।

কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে নিজের বিদ্যাপীঠ সরকারি তিতুমীর কলেজের গণিত বিভাগেই তিনি শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন ৩৫তম বিসিএসের মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের সদস্য হিসেবে।

বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস রিও গ্র্যান্ডে ভ্যালিতে (ইউটিআরজিভি) পূর্ণ অর্থায়নে পিএইচডি গবেষণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। এর আগে তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ধূসর টি-শার্ট থেকে বিলাসবহুল ফ্যাশনে, মার্ক জাকারবার্গের বদলে যাওয়া স্টাইল। মানবজাতির যাত্রাপথ চিরতরে বদলে যাবে, বলছেন নোবেলজয়ী চিকিৎসক।

শিক্ষাজীবনে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার পরও পছন্দের বিষয় না পাওয়ায় সেখানে ভর্তি হননি আল আমীন। গণিতের প্রতি গভীর ভালোবাসাই তাঁকে এই বিষয়ের দিকে টেনে নেয়। শিক্ষক হিসেবে তিতুমীর কলেজে ফেরার অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, প্রাক্তন শিক্ষকদের সঙ্গে সহকর্মী হিসেবে কাজ করার অনুভূতি ছিল অনন্য। তাঁর ক্লাসে কেবল গণিতের শিক্ষার্থীরাই নয়, বরং মনোবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরাও আগ্রহ নিয়ে উপস্থিত থাকতেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গণিতচর্চার পাশাপাশি তিনি তাদের স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের গন্তব্য নিয়ে নিয়মিত আলোচনা করতেন। ছাত্রজীবনে প্রতি রোববার ‘স্বপ্ন নিয়ে’ পড়তেন। তবে পছন্দের সাবজেক্ট না পাওয়ায় শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের জন্য অপছন্দের বিষয়ে পড়তে চাননি। শিক্ষকতা করতে গিয়ে আল আমীন বুঝেছেন, একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের বিষয় শেখান না, শিক্ষার্থীর চিন্তা ও আত্মবিশ্বাস গঠনেও ভূমিকা রাখেন। ক্লাস করানোর সময় বিভাগের বাইরের শিক্ষার্থীরাও নাকি আল আমীনের ক্লাসে এসে বসে থাকতেন। ছোটদের উদ্দেশে আল আমীনের বার্তা, ‘নিজের শুরুকে কখনো ছোট করে দেখবেন না।

অনেক শিক্ষার্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ না পেয়ে হতাশায় নিমজ্জিত থাকত। তাদের উদ্দেশ্যে আল আমীন বলতেন, ‘আমি তাদের বলতাম, আমিও এই কলেজের শিক্ষার্থী ছিলাম। আমি বিসিএসে টিকেছি, ব্যাংকের চাকরির সুযোগ পেয়েছি। তুমি কোন প্রতিষ্ঠানে পড়ছ, সেটা তোমার ভবিষ্যতের সীমা নির্ধারণ করে না। তুমি যদি সত্যি বড় স্বপ্ন দেখতে পারো, স্বপ্ন অবশ্যই পূরণ করা সম্ভব।’ অন্যের সাফল্যের গল্প পড়ে ভাবতেন, একদিন হয়তো তাঁর জীবনও কাউকে স্বপ্ন দেখতে সাহস জোগাবে। আপনি কোন প্রতিষ্ঠানে পড়ছেন, কোন অঞ্চল থেকে এসেছেন অথবা প্রথমবার কোথায় সুযোগ পাননি, এগুলোর কোনোটিই আপনার শেষ পরিচয় নয়।’।

শিক্ষকতা পেশায় থাকাকালীনই আল আমীনের গবেষণার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস ও কম্পিউটেশনাল সায়েন্সের সঙ্গে গণিতের যোগসূত্র তাঁকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। এই আগ্রহ থেকেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার পথ বেছে নেন। পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পূর্ণ অর্থায়নে পিএইচডির সুযোগ পাওয়ার পর তিনি ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস রিও গ্র্যান্ডে ভ্যালিকে বেছে নেন। বর্তমানে তিনি সেখানে গ্র্যাজুয়েট রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করছেন।

তাঁর গবেষণার মূল বিষয়বস্তু হলো গাণিতিক অপটিমাইজেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিংয়ের সমন্বয়। আল আমীন বলেন, ‘শিল্পকারখানা, গুদাম ও হাসপাতালের মতো জায়গায় স্বয়ংক্রিয় রোবটের ব্যবহার বাড়ছে। ফলে মানুষের সঙ্গে একই পরিবেশে রোবটের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আমার গবেষণার অভিজ্ঞতা থেকে আমি একটা বিষয় শিখেছি, কোনো মডেল প্রথমবার কাজ না করলে হাল ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। সমস্যার কারণ খুঁজতে হয়, নতুন পদ্ধতি চেষ্টা করতে হয়।’

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থার পার্থক্য নিয়ে আল আমীন মনে করেন, দুই দেশেরই নিজস্ব ইতিবাচক দিক রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণার পরিবেশ, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও ল্যাব সুবিধাসমূহ অনেক বেশি উন্নত। ভবিষ্যতে তিনি বাংলাদেশের গণিত শিক্ষায় স্নাতক পর্যায় থেকে গবেষণার সংস্কৃতি যুক্ত করা, কম্পিউটার সায়েন্সের সঙ্গে সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যৌথ গবেষণার সুযোগ বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। কলেজপড়ুয়া দুই ভাই কীভাবে পেলেন ৩০ হাজার ডলারের বিনিয়োগ।

পিএইচডি শেষ করে গবেষণার কাজকে আরও বিস্তৃত করার পাশাপাশি তিনি দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক মেন্টরশিপের সুযোগ তৈরিতে কাজ করতে চান। তাঁর মতে, নিজের শুরুটা কেমন ছিল তা বড় বিষয় নয়, মূল বিষয় হলো লক্ষ্য অটুট রাখা। আল আমীন বলেন, ‘আজ যদি আমার গল্প পড়ে মফস্‌সলের কোনো একজন শিক্ষার্থী নিজের মনে একবার বলে, “আমিও পারব”, তাহলে সেটিই আমার জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’