‘নিচে নেমে মনে হচ্ছিল যেন কোনো ভৌতিক সিনেমার দৃশ্য দেখছি। চারদিকে শুধু ধ্বংসস্তূপ। সেগুলো টপকে কোনোমতে বেরিয়ে আসতে হয়েছে’—ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর রাজধানী কারাকাসে ধসে পড়া একটি ভবনের পাশের বাসিন্দা মারিয়া আলেহান্দ্রা এভাবেই সেই মুহূর্তের কথা বর্ণনা করছিলেন।
গত বুধবার ভেনেজুয়েলায় এক মিনিটের কম সময়ের ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে নিহত মানুষের সংখ্যা বেড়ে ২৩৫–এ দাঁড়িয়েছে। এখন পর্যন্ত দেড় হাজারের বেশি মানুষ আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কারাকাস ও আশপাশের এলাকায় কয়েক ডজন ভবন ধসে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, প্রথমে রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ২ মাত্রার একটি ভূমিকম্প কারাকাসের প্রায় ১৬০ কিলোমিটার পশ্চিমে আঘাত হানে। এর ১ মিনিটের কম সময়ে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার আরও শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়। ইউএসজিএসের পূর্বাভাস বলছে, হতাহত ব্যক্তির সংখ্যা শেষ পর্যন্ত হাজার হাজার হতে পারে। মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ভূমিকম্পের পর ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারে ছুটছেন উদ্ধারকর্মীরা। অনেকে নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে বের করতে মরিয়া হয়ে সাহায্য চাইছেন। কয়েকজন জীবিত ব্যক্তিকে স্ট্রেচারে করে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।
মারিয়া আলেহান্দ্রা বলেন, ‘ধ্বংসস্তূপ টপকে আমাদের বের হতে হয়েছে। আমাদের ভবনের তত্ত্বাবধায়ক তাঁর শিশুকে নিয়ে এবং অন্য প্রতিবেশীরা আতঙ্কে নিচে নেমে এসেছিলেন। কিন্তু ধসে পড়া ওই ভবন থেকে আমি শুধু একটি পরিবারকেই বের হতে দেখেছি।’
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, ‘অনেক ভবন ধসে পড়েছে। যত বেশি সম্ভব মানুষকে জীবিত উদ্ধার করার জন্য অত্যন্ত জোরাল অভিযান চলছে। এটি সত্যিকারের একটি ট্র্যাজেডি।’ ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতাদের উদ্যোগে চালু করা একটি ওয়েবসাইটে স্থানীয় সময় গতকাল বৃহস্পতিবার রাত দুইটার কিছু পর পর্যন্ত ৬ হাজার ৬০০–এর বেশি মানুষ নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। জাতীয় ছুটির দিনে বিকেলে ভূমিকম্প দুটি আঘাত হানায় অনেক মানুষ তখন বাড়িঘরে ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানস্থলে ছিলেন।
পূর্ব কারাকাসের বাসিন্দা ৫৬ বছর বয়সী কোরো মার্তিনেজ বলেন, ‘খুব জোরে একটা বিকট শব্দ হয়। ঘরের জিনিসপত্র সব পড়ে যেতে থাকে। জীবনে এমন কিছু কখনো দেখিনি।’ পশ্চিম কারাকাসের বাসিন্দা ৪১ বছর বয়সী অ্যাস্ট্রিড রামিরেজ বলেন, ‘কম্পন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে মানুষের চিৎকার শুনতে পাই। সবাই সিঁড়ি বেয়ে নিচে দৌড়াতে শুরু করে।’ দক্ষিণ কারাকাসের ৮০ বছর বয়সী মারিয়া রোমেরো বলেন, পুলিশ তাঁকে বাড়ি থেকে বের হতে সহায়তা করেছে। তাঁর ভাষায়, ‘এই ভূমিকম্প ছিল ভয়াবহ; এমনকি ১৯৬৭ সালের ভূমিকম্পের চেয়েও।’
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মাইকেতিয়া বিমানবন্দর থেকে ভিডিও বার্তায় সাবেক আইনপ্রণেতা উইলমের আজুয়াহে বলেন, ‘পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। শক্তিশালী ভূমিকম্পে সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে গেছে।’ কারাকাসের মেডিক্যাল শিক্ষার্থী হুয়ান অর্তিজ বলেন, ‘আমি হতবাক ও কিংকর্তব্যবিমূঢ়। আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু মারা গেছে। আরেকজন ধ্বংসস্তূপে আটকা পড়েছেন। উপকূলীয় এলাকায় আমার পরিচিত আরও প্রায় ২০ জন নিখোঁজ।’
ভূমিকম্পের পর এ পর্যন্ত একের পর এক অন্তত ৩০টি পরাঘাত অনুভূত হয়েছে। দেলসি রদ্রিগেজ বলেন, উদ্ধারকাজে সহায়তা করতে বিভিন্ন দেশ থেকে উদ্ধারকারীরা ভেনেজুয়েলায় আসছেন। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ কয়েকজন বিদেশি নেতাকে সহায়তার প্রস্তাব দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন। ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘ভেনেজুয়েলায় যে দুটি বড় ভূমিকম্প হয়েছে, তা ভয়াবহ প্রাণহানির কারণ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দিতে প্রস্তুত, ইচ্ছুক ও সক্ষম।’
কারাকাসের হাসপাতালগুলোয় আহত মানুষের চাপ সামলাতে চিকিৎসক ও কর্মীদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র নিরূপণে কর্তৃপক্ষ সপ্তাহের বাকি সময়ের জন্য সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, এল সালভাদর, ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র, ব্রাজিল, স্পেনসহ বিভিন্ন দেশ ভেনেজুয়েলাকে সহায়তা ও সংহতির বার্তা দিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, তারা ভেনেজুয়েলা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে এবং জরুরি সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতাদের উদ্যোগে চালু করা একটি ওয়েবসাইটে স্থানীয় সময় গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত দুইটার কিছু পর পর্যন্ত ৬ হাজার ৬০০–এর বেশি মানুষ নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
