ঋতুচক্রের আবর্তনে এখন বর্ষাকাল। আষাঢ়-শ্রাবণের বৃষ্টিস্নাত দিনগুলোতে প্রকৃতি যেন নতুন জীবন ফিরে পায়। বৃষ্টিতে ধুয়ে-মুছে সতেজ হয়ে ওঠে গাছপালা, মাঠ-ঘাট এবং জনপদ। এই সময়ে সবুজের সমারোহের সঙ্গে প্রকৃতিতে যুক্ত হয় নানা রঙের ফুলের এক অপূর্ব সমাবেশ। সাদা, নীল, লাল অথবা বেগুনি রঙের অসংখ্য ফুল বর্ষার পরিবেশকে আরও মোহনীয় করে তোলে।
কবি ও সাহিত্যিকদের কাছে বর্ষা এক প্রিয় ঋতু। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত পঙ্ক্তি- “নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে, ওগো আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে” -বর্ষার সেই চিরচেনা আবহকে যেন জীবন্ত করে তোলে। ঝুম বৃষ্টির অবিরাম শব্দ, ভেজা মাটির মনমাতানো গন্ধ আর ফুলের সুবাস মিলেমিশে এক অনন্য অনুভূতি তৈরি হয়।
বর্ষার আগমনী বার্তা নিয়ে ফোটে কদম ফুল। গোলাকার এই ফুলকে বর্ষার এক অবিচ্ছেদ্য প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়। ছোট্ট কুঁড়ি থেকে ধীরে ধীরে অসংখ্য সরু পাপড়ি মেলে ধরে কদম, আর এর চারপাশ ছড়িয়ে দেয় এক স্নিগ্ধ সৌন্দর্যের আবেশ। কদম ছাড়া বর্ষার রূপ যেন অসম্পূর্ণ। বর্তমানে রংপুরের পায়রাবন্দে অবস্থিত বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র ছাড়াও নগরীর বিভিন্ন সড়ক ও উদ্যান এলাকায় দেখা মিলছে কলাবতী, লিলি, স্পাইডার লিলি (যা সুখদর্শ বা গো-রসুন নামেও পরিচিত), সর্পগন্ধা, উলটচণ্ডাল, উলটকম্বল এবং নিশিন্দাসহ বহু প্রজাতির ফুলের। বর্ষার ভেজা বাতাসে এসব ফুলের সুবাস প্রকৃতিকে আরও সজীব ও প্রাণবন্ত করে তোলে।
বাংলা অ্যাকাডেমির সহপরিচালক এবং বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কৃষিবিদ আবিদ করিম মুন্না জানান, বর্ষা বাংলাদেশের চিরায়ত প্রকৃতির এক অন্যতম সৌন্দর্যময় অধ্যায়। এই ঋতুতে হিজল, চালতা, শাপলা, শালুক, বড়নখা, চন্দ্রমালা এবং কচুরিপানার মতো বিভিন্ন জলজ ফুলেরও দেখা পাওয়া যায়। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এসব ফুলের মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঔষধি গুণসম্পন্নও রয়েছে।
কৃষিবিদ আবিদ করিম মুন্না আরও বলেন, জারুল ফুলের মতো দেখতে ক্রেপ মার্টেল বা ফুরুস ফুলকে অনেকেই ভুলবশত চেরি ফুল মনে করেন। এছাড়াও, বর্ষার সৌন্দর্যকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে নাগলিঙ্গম, হাসনাহেনা, নিশিপদ্ম, বাওবাব, জুঁই, চামেলি, হংসলতা, দোলনচাঁপা এবং সুলতান চাঁপাসহ আরও অসংখ্য প্রজাতির ফুল।
বর্ষা কেবল বৃষ্টির ঋতু নয়, এটি ফুলেরও ঋতু। প্রকৃতির সবুজ ক্যানভাসে রঙের তুলির আঁচড় কেটে এসব ফুল যেন এই বার্তাই দেয় যে, বাংলার মাটি ও প্রকৃতিতে সৌন্দর্য এখনও সজীব ও প্রাণবন্ত। ভেজা বাতাসে দুলতে থাকা এই ফুলগুলোই তাই বর্ষার সবচেয়ে সুন্দর অলঙ্কার হয়ে ওঠে।
