ইরানের পরমাণু কর্মসূচি: ইউরেনিয়াম মজুত নিয়ে আইএইএ’র নতুন উদ্বেগ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রায় তিন মাস পর ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সংক্রান্ত প্রথম প্রতিবেদন সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে পাঠিয়েছে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)। এই প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানিয়েছে যে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে তাদের মূল্যায়নে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। একই সাথে, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে তাদের পূর্বের উদ্বেগ এখনো বিদ্যমান রয়েছে।

বৃহস্পতিবার সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে প্রেরিত এই প্রতিবেদনে আইএইএ তেহরানকে আবারও তাদের পরমাণু কর্মসূচি এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এর মাধ্যমে ধারণা করা হচ্ছে যে, ইরানের কাছে থাকা বিপুল পরিমাণ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সাম্প্রতিক যুদ্ধে বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়নি। প্রায় এক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের প্রধান পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, এরপর থেকে ওই ইউরেনিয়াম মজুত সম্পর্কে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ইরানও এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট বার্তা দেয়নি।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নতুন বিমান হামলা শুরুর আগ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এটি আইএইএ-এর প্রথম প্রতিবেদন। ওই হামলার অন্যতম ঘোষিত লক্ষ্য ছিল ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন থেকে বিরত রাখা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একাধিকবার দাবি করেছেন যে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করাই সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল।

ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার ক্ষেত্রেও একটি বড় অচলাবস্থার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলমান আলোচনায় ট্রাম্প প্রশাসন তেহরানকে এই মজুত ত্যাগ করার আহ্বান জানিয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে একটি প্রাথমিক চুক্তির দিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যেখানে পারমাণবিক বিষয়গুলো পরবর্তী আলোচনার জন্য স্থগিত রাখা হতে পারে।

আগামী সপ্তাহে আইএইএ-এর ৩৫ সদস্যবিশিষ্ট বোর্ড অব গভর্নরসের ত্রৈমাসিক বৈঠকের আগে প্রকাশিত দুটি গোপন প্রতিবেদনের মধ্যে এটি ছিল একটি। বার্তা সংস্থা রয়টার্স কর্তৃক দেখা নথিগুলোতে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকের আগের প্রতিবেদনের তুলনায় খুব সামান্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আইএইএ-এর মহাপরিচালক ইরানকে জোর দিয়ে জানিয়েছেন, পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) অনুযায়ী নিরাপত্তা তদারকি চুক্তি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি এবং কোনো পরিস্থিতিতেই ইরান একতরফাভাবে এর বাস্তবায়ন স্থগিত রাখতে পারে না।

আইএইএ এখনো গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে পুনরায় প্রবেশ করতে পারেনি। একই সাথে, ইরানও সংস্থাটিকে জানায়নি তাদের স্বল্প ও উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বর্তমান মজুত কোথায় এবং কী অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামও রয়েছে, যা প্রায় ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধতার অস্ত্র-উপযোগী ইউরেনিয়ামে রূপান্তরের খুব কাছাকাছি।

আইএইএ সতর্ক করে বলেছে যে, প্রায় এক বছর ধরে ঘোষিত ইউরেনিয়াম মজুত যাচাই করতে না পারা অস্ত্র বিস্তারের উদ্বেগ তৈরি করছে এবং এটি এনপিটি নিরাপত্তা চুক্তি পালনের ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক। সংস্থাটির মতে, এত দীর্ঘ সময় পর্যবেক্ষণের বাইরে থাকলে পারমাণবিক উপাদানের অবস্থান সম্পর্কে ধারাবাহিক তথ্য বা ‘জ্ঞানগত ধারাবাহিকতা’ হারিয়ে যায়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, ইরানের ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোতে পূর্বে ঘোষিত সব পারমাণবিক উপাদান সম্পর্কে ধারাবাহিক তথ্য পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত জরুরি।